একসময় স্বাদ ও সুগন্ধের জন্য দেশজুড়ে খ্যাতি ছিল টাঙ্গাইলের মধুপুরের আনারসের। তবে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে সেই ঐতিহ্যবাহী আনারস এখন নিজস্ব স্বাদ ও ঘ্রাণ হারাচ্ছে। আকারে বড় ও দেখতে আকর্ষণীয় হলেও স্বাদে পরিবর্তন আসায় ক্রেতাদের আগ্রহ কমছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারদরেও; গত বছরের তুলনায় এবার কম দামে আনারস বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা।
মধুপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মমতাজ মুনা বলেন, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আরও কার্যক্রম নেওয়া হবে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশের অন্যতম প্রধান আনারস উৎপাদন এলাকা মধুপুরে চলতি মৌসুমে ৬ হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ক্যালেন্ডার বা জায়ান্ট কিউ জাতের আনারস ৪ হাজার ৩৭৫ হেক্টর, জলডুগি ২ হাজার ২৪৫ হেক্টর এবং এমডি-২ জাত ১৮ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ টন আনারস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে। মৌসুমের শুরু থেকেই গারোর বাজার ও জলছত্রের পাইকারি হাটে আনারস বিক্রি করছেন কৃষকেরা। তবে ভালো ফলনের বিপরীতে বাজারদর কমে যাওয়ায় তাঁরা কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না।
হাগুড়াকুড়ি গ্রামের চাষি সোহেল রানা চার বিঘা জমিতে ২২ হাজার আনারস চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, কোনো রাসায়নিক বা হরমোন ব্যবহার না করায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে তুলনামূলক বেশি দামে আনারস বিক্রি করতে হয়। কিন্তু অনেক ক্রেতা সেই দাম দিতে রাজি না হওয়ায় কিছু কৃষক রাসায়নিক ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন।
গত মঙ্গলবার গারোর বাজার ও জলছত্রের পাইকারি হাটে চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনারসের আকার বড় করা, একই সময়ে ফল ধরানো এবং দ্রুত পাকানোর জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ফল দেখতে আকর্ষণীয় হলেও স্বাদ ও ঘ্রাণে আগের বৈশিষ্ট্য থাকছে না। ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, আনারসের আকার বাড়াতে প্যানোফিক্স, সুপারফিক্স, ক্রপকেয়ার ও অঙ্কুরসহ বিভিন্ন রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। দ্রুত পাকানোর জন্য রাইফেন, হারবেস্ট, প্রমোট, সারাগোল্ড, ক্রিটিপাস ও অ্যালপেনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এসব রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে অপরিপক্ব গাছেও ফল ধরানো সম্ভব হয় বলে জানান তাঁরা। স্থানীয়ভাবে এই পদ্ধতিকে চাষিরা ‘গর্ভবতী’ নামে অভিহিত করেন।
জলছত্র বাজারের আনারসচাষি রনি মিয়া বলেন, গত বছর যে আনারস ৩০ থেকে ৩৫ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি করেছেন, এবার একই আকারের আনারস ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
হাগুড়াকুড়ি গ্রামের আরেক চাষি মিজানুর রহমান বলেন, রাসায়নিক স্প্রে করার পর চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই আনারসগুলো পাকতে শুরু করে। ফলে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আনারস বাজারে দেওয়া যায়। অন্যদিকে রাসায়নিক ব্যবহার না করলে ফল ধীরে ধীরে পাকে, ফলে বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়।
গারোর বাজারের আনারসের পাইকারি ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন বলেন, রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। তাঁর মতে, আগে ধাপে ধাপে আনারস বাজারে আসায় বিক্রি ও লাভ—দুটিই ভালো ছিল। এখন একই সময়ে বেশি আনারস বাজারে আসায় দাম কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি স্বাদও আগের মতো নেই।
মধুপুরের গারো সম্প্রদায়ের প্রবীণ বাসিন্দা অজয় এ মৃ জানান, পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মেঘালয় থেকে চারা এনে মধুপুর গড় এলাকায় আনারসের চাষ শুরু হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই এ অঞ্চলের আনারস সারা দেশে পরিচিতি পায়।
অজয় এ মৃ বলেন, গত প্রায় দুই দশকে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এসে জমি ইজারা নিয়ে আনারস চাষ করছেন। অতিরিক্ত লাভের আশায় তাঁদের কেউ কেউ হরমোন ও রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। এতে আনারসের স্বাদ নষ্ট হচ্ছে এবং পরিমিত রাসায়নিক বা রাসায়নিকমুক্ত পদ্ধতিতে চাষ করা কৃষকেরাও সমস্যায় পড়ছেন।
চাষিদের ভাষ্য, স্বাভাবিকভাবে একটি আনারসগাছে প্রায় ৬০টি পাতা হওয়ার পর ফল ধরে। কিন্তু ২৮টি পাতা হওয়ার পরই এসব রাসায়নিক প্রয়োগ করলে আগেভাগে আনারস ধরানো যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শহীদ মাহমুদ বলেন, ‘মধুপুরের আনারস এ অঞ্চলের ঐতিহ্য। অতিরিক্ত হরমোন ও রাসায়নিক ব্যবহারে সেই ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকদের সচেতন করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।’
জমিতে রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়ে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আজিজুল হক বলেন, কৃষিকাজে বা আনারস উৎপাদনে অণুজীবের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পরিমিত রাসায়নিক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষকদের কৃষি বিভাগের নির্দেশনা ও পরামর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ করা উচিত।
