বাংলাদেশের শীতকালীন অতিথি বিরল পরিযায়ী পাখি তুষারাভ্রু চটক (Snowy-browed Flycatcher) তার আকর্ষণীয় রঙ, সাদা প্রশস্ত ভ্রুরেখা ও সুমধুর ডাকার জন্য প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখিপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। আকারে ছোট হলেও এই পাখির সৌন্দর্য ও বিরল উপস্থিতি একে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পরিযায়ী পাখিতে পরিণত করেছে।
পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আ ন ম আমিনুর রহমান জানান, ২০১৮ সালের ৬ মার্চ হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের একটি ছোট জলাশয়ে তিনি প্রথম পুরুষ তুষারাভ্রু চটকের ছবি ধারণ করেন। বন বিভাগের তৈরি ওই জলাশয়টি শুষ্ক মৌসুমে বন্য প্রাণীদের পানির চাহিদা পূরণের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর পাখিটি জলাশয়ে নেমে গোসল করতে দেখা যায়। পরে একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর তিনি স্ত্রী তুষারাভ্রু চটকেরও দেখা পান।
তুষারাভ্রু চটকের ইংরেজি নাম Snowy-browed Flycatcher এবং বৈজ্ঞানিক নাম Ficedula hyperythra। এটি Muscicapidae গোত্রের একটি পরিযায়ী পাখি। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ প্রজাতির বিস্তৃতি রয়েছে।
মাত্র ১১ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য ও প্রায় ৯ গ্রাম ওজনের এ পাখির পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে একেবারেই ভিন্ন। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ পাখির দেহের ওপরের অংশ ধূসর-নীল এবং নিচের অংশ লালচে-কমলা রঙের। এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো চোখের ওপরের তুষারের মতো সাদা ও প্রশস্ত ভ্রুরেখা। অন্যদিকে স্ত্রী পাখির দেহ জলপাই-বাদামি রঙের এবং বুক ও গলা ঘিয়ে-সাদা। উভয়ের চোখ বাদামি, ঠোঁট কালো এবং পা নীলচে-কালো বর্ণের।
বাংলাদেশে শীত মৌসুমে প্রধানত সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনাঞ্চলে এ পাখির দেখা মেলে। তবে খুব কম ক্ষেত্রে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের পাতাঝরা বনেও এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। আর্দ্র ও ঘন জঙ্গলের নিচু ঝোপঝাড় এবং বাঁশবনে একা বা জোড়ায় বিচরণ করে। কীটপতঙ্গ, কেঁচো এবং ছোট ফল এদের প্রধান খাদ্য। সুমধুর সুরে ডাকার জন্যও এ প্রজাতিটি পরিচিত।
এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। মূল আবাসস্থলের পাহাড়ি এলাকায় পাথরের ফাঁক, গাছের গোড়া কিংবা শিকড়ের মধ্যে কাপের মতো ছোট বাসা তৈরি করে স্ত্রী পাখি সাধারণত তিন থেকে চারটি ডিম পাড়ে। ডিমে তা দেওয়া এবং ছানা লালন-পালনের দায়িত্ব স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েই পালন করে। সাধারণত এদের আয়ুষ্কাল দুই থেকে তিন বছর হলেও অনুকূল পরিবেশে আট থেকে নয় বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিরল এই পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা গেলে ভবিষ্যতেও শীত মৌসুমে বাংলাদেশের বনাঞ্চলে তুষারাভ্রু চটকের দেখা মিলবে।
