আল–জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। ইরানের সঙ্গে পাঁচ মাসের যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে অস্ত্রের মজুতে চাপ তৈরি হওয়ায় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল গত শনিবার এক বিবৃতিতে জানান, সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় অস্ত্র দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষা দপ্তর অস্ত্র কেনার পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে গত এক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে পারনেল বলেন, শুধু ইরানের সঙ্গে চলমান পাঁচ মাসের যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার আধুনিকায়ন এবং প্রতিরক্ষাশিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি বড় কর্মসূচি চলছিল।
গত বুধবার মার্কিন উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গ অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের কাছে একটি চিঠি পাঠান। এতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের সরবরাহ দ্রুত বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা জানাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ২১ দিন সময় দেওয়া হয়।
চিঠিতে ফেইনবার্গ উল্লেখ করেন, বছরের পর বছর ধরে অস্ত্র উৎপাদনের প্রচলিত ধীরগতির প্রক্রিয়া আর গ্রহণযোগ্য নয়। ভবিষ্যতে আরও দ্রুত অস্ত্র তৈরি এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র পারনেল শনিবার নিশ্চিত করেন, দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়ে ফেইনবার্গের চিঠি পাঠানোর বিষয়টি সত্য। তাঁর ভাষ্য, এই নির্দেশনা ২০২৮ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে ব্যবহার করা হবে। পরে ওই বাজেট অর্থ বরাদ্দের জন্য কংগ্রেসে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাশিল্পের সক্ষমতা পুনর্গঠনের চলমান উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত ইরান যুদ্ধের আগেই কমছিল। যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছিল ২ হাজার ৩৩০টি। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সময় সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩০টিতে।
সাম্প্রতিক লড়াইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র এখন ৭৫৯ থেকে ৮২৭টির মধ্যে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় মজুত কমেছে অন্তত ৬৫ শতাংশ।
থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ছিল ৪৫২টি। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার সময় তা কমে ২৩২ থেকে ২৬২টির মধ্যে নেমে আসে। পরে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র মজুতে যুক্ত হওয়ায় সংখ্যা বেড়ে ২৩৪ থেকে ২৭৮টির মধ্যে হয়েছে। তারপরও যুদ্ধের আগের তুলনায় থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত অন্তত ৩৮ শতাংশ কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হলেও প্যাট্রিয়ট ও থাড ব্যবস্থার মজুত যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে।
সিএসআইএসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির মিত্ররা এসব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহারে আরও সতর্ক হতে পারে।
ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে মার্কিন বাহিনী কমসংখ্যক প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলে ইরানের ছোড়া অস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সিএসআইএসের বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন মেরিন কর্মকর্তা মার্ক ক্যানসিয়ান বুধবার আল–জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত খুব বেশি নেই এবং এগুলোর কার্যকর বিকল্পও সীমিত। তাঁর ভাষ্য, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে গেলে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে প্রবেশ করতে পারে।
অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি আবারও দাবি করেন, পাঁচ মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অস্ত্রের মজুত নিয়ে কোনো কৌশলগত সমস্যায় পড়েনি।
নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে। বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্রের মজুত অনেক বেশি বলেও দাবি করেন তিনি। প্রয়োজন অনুযায়ী বড় চালানে অস্ত্র তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে বলে জানান ট্রাম্প।
তাঁর দাবি, প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র উৎপাদনের কারখানা নির্মাণ করছে।
চলতি মাসের শুরুতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশের উৎপাদন বাড়াতে প্রতিরক্ষা খাতের বড় দুই প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ও নর্থরপ গ্রুম্যানের সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
এদিকে মার্কিন কংগ্রেসে প্রতিরক্ষা ব্যয়সংক্রান্ত একটি বিল আটকে আছে। ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক অভিযান নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। একই সঙ্গে পেন্টাগনের বাজেট গত বছরের প্রায় ৯০ হাজার কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার করার জন্য হোয়াইট হাউসের অনুরোধ নিয়েও আপত্তি রয়েছে তাঁদের।
পেন্টাগনের অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের মধ্যেই এ বাজেট নিয়ে কংগ্রেসের আপত্তি ও অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
