এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলশিক্ষার্থীদের টিকাদানসংক্রান্ত নীতি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়ে নতুন নির্বাহী আদেশে সই করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে হাম, মাম্পস ও রুবেলার (এমএমআর) সমন্বিত টিকাকে তিনটি পৃথক টিকা হিসেবে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের অনেকে এই পদক্ষেপকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে সমালোচনা করেছেন।
গতকাল সোমবার ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে নির্বাহী আদেশে সই করেন ট্রাম্প। আদেশে স্কুলে ভর্তি ও উপস্থিতির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করার নীতিগুলো পর্যালোচনার জন্য অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলগুলোকে পরামর্শ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে স্কুলে ভর্তি বা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির জন্য টিকা বাধ্যতামূলক করার ক্ষমতা মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। ফলে এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশকে সরাসরি বাধ্যতামূলক নির্দেশের পরিবর্তে পরামর্শ বা সুপারিশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, ‘স্কুলে ভর্তি ও উপস্থিতির মতো ক্ষেত্রে টিকা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার বিষয়ে’ ট্রাম্প প্রশাসনের সুপারিশগুলো অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলগুলোকে পর্যালোচনা করতে বলা হচ্ছে।
আদেশের আরেক অংশে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ একটি টাস্কফোর্স গঠন করবে। এই টাস্কফোর্স বেসরকারি খাত এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে এমএমআর টিকার তিনটি উপাদান আলাদাভাবে দেওয়ার উদ্যোগ নেবে।
তবে একই সঙ্গে সমন্বিত এমএমআর টিকা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীর প্রয়োজনীয় টিকার সরবরাহ চালু রাখার কথাও বলা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে এমএমআর টিকার সমন্বিত ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, একটি টিকার মাধ্যমে শিশুদের দ্রুত সুরক্ষা দেওয়া যায়। বিশেষ করে যেসব মা–বাবার পক্ষে একাধিকবার টিকা দেওয়ার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া কঠিন, তাঁদের জন্যও সমন্বিত টিকা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু রেসিন সাংবাদিকদের বলেন, এমএমআর টিকার তিনটি উপাদান আলাদা করে পৃথক টিকা হিসেবে তৈরি ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় এক দশকের বেশি সময় লেগে যেতে পারে।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের সমালোচনা করেছেন নিউইয়র্ক নগরের স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিশনার অ্যালিস্টার মার্টিন। তিনি বলেছেন, এই পদক্ষেপ ‘রাজনীতি ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ওপর’ ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে।
এক বিবৃতিতে মার্টিন বলেন, ‘সৌভাগ্যক্রমে, টিকা দেওয়ার সুপারিশ প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করেন না, আর তা করা উচিতও নয়।’
অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, ‘শহর ও অঙ্গরাজ্যগুলো নিজেদের টিকা দেওয়ার সুপারিশ ও বাধ্যতামূলক নিয়ম নির্ধারণ করতে পারে। নিউইয়র্ক নগরসহ অনেক জায়গা কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশ থেকে সরে এসেছে। কারণ, দিন দিন সেসব সুপারিশ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন হয়ে পড়েছে।’
চিকিৎসাবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় এমএমআরের সমন্বিত টিকাকে নিরাপদ হিসেবে প্রমাণ করা হয়েছে। তবে নির্বাহী আদেশে সইয়ের সময় ট্রাম্প এ বিষয়ে একাধিক বিতর্কিত বক্তব্য দেন।
ট্রাম্প প্রশাসনে টিকা নীতিতে কড়াকড়ি আনা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ নীতির অন্যতম প্রবক্তা স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র। তিনি টিকাবিরোধী একটি অলাভজনক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা।
কেনেডি দীর্ঘদিন ধরে টিকা নেওয়ার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রচার করে আসছেন। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশের সমালোচনা করে চিকিৎসক ও সিনেটর বিল ক্যাসিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ মানুষের মধ্যে টিকা নেওয়ার অনীহা বাড়াবে এবং শিশুদের নিরাপত্তা আরও কমিয়ে দেবে।
ক্যাসিডি বলেন, ‘এই নির্বাহী আদেশটি ভুল। প্রেসিডেন্টের এসব পরিবর্তন করার মতো বিশেষজ্ঞ জ্ঞান নেই। টিকা অত্যন্ত নিরাপদ। টিকা কার্যকর। টিকা অটিজম তৈরি করে না।’
যুক্তরাষ্ট্রে গত ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের সময়েই ট্রাম্প প্রশাসন টিকা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিল। চলতি বছরের শুরুতে একটি ফেডারেল আদালত প্রশাসনের এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা স্থগিত করেছিলেন।
আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত ওই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে। কয়েকটি বড় চিকিৎসা সংগঠনের পক্ষে আদালতের ওই সিদ্ধান্ত আসে। সংগঠনগুলোর বক্তব্য ছিল, টিকা নীতিতে পরিবর্তন আনার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপ আইনসম্মত নয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের টিকা নীতির সমালোচকেরা বলছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনেডির টিকাবিরোধী অবস্থান এবং নিরাপদ ও কার্যকর টিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় তৈরির প্রচেষ্টা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তবে জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, এখনো অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক টিকাদানের পক্ষে রয়েছেন। গত কয়েক মাসে কেনেডি ও ট্রাম্প দুজনকেই টিকাবিরোধী বক্তব্য থেকে কিছুটা সরে আসতে দেখা গেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এ ধরনের অবস্থানের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে।
তবে সোমবারের নির্বাহী আদেশে সইয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, টিকা নীতির পরিবর্তন এখনো ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাস্থ্যনীতি কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ট্রাম্প ও কেনেডি দুজনই টিকা ও অটিজম নিয়ে এমন ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, যা বহু বছরের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
