চাচাতো, মামাতো, খালাতো বা ফুফাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি। তবে গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, ঘনিষ্ঠ রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সন্তানের কিছু জিনগত ও জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ডে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায় ফার্স্ট কাজিন দম্পতির সন্তানদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকি সাধারণ দম্পতির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক রীতি, পারিবারিক সম্পদ নিজেদের মধ্যে ধরে রাখা কিংবা আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার মতো বিভিন্ন কারণে অনেক সমাজে কাজিনদের মধ্যে বিয়ের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের ফলে একই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ জিন বাবা ও মা—উভয়ের কাছ থেকেই সন্তানের শরীরে আসার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড শহরে পরিচালিত ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ নামের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় প্রায় ১৩ হাজার শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটিতে দেখা যায়, রক্তের সম্পর্কযুক্ত দম্পতিদের সন্তানদের জিনগত বা জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানোর আশঙ্কা সাধারণ দম্পতিদের তুলনায় বেশি।
চিকিৎসকদের হিসাবে, সাধারণ দম্পতিদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকি প্রায় ৩ শতাংশ। ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ে হলে সেই ঝুঁকি বেড়ে প্রায় ৬ শতাংশ হতে পারে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একই বংশের সদস্যদের পূর্বপুরুষ অভিন্ন হওয়ায় তাদের শরীরে একই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ জিন থাকার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। বাবা ও মা দুজনের কাছ থেকেই একই ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের মধ্যে এলে বংশগত রোগ বা জন্মগত জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তবে কাজিনদের মধ্যে বিয়ে হলেই সন্তান অসুস্থ হবে—এমন কোনো কথা গবেষণায় বলা হয়নি। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে করা অনেক দম্পতির সন্তানই সম্পূর্ণ সুস্থভাবে জন্ম নেয়।
গবেষণায় আলোচিত ঝুঁকির সঙ্গে শুধু সরাসরি রক্তের সম্পর্কই নয়, ‘এন্ডোগামি’ বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিয়ের রীতিও সম্পর্কিত। কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ছোট জনগোষ্ঠীর সদস্যরা দীর্ঘদিন নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যেই বিয়ে করলে সরাসরি নিকটাত্মীয় না হলেও একই ধরনের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও ত্রুটিপূর্ণ জিনের উপস্থিতির সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
এ ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় ইউরোপের নরওয়েতে কাজিনদের মধ্যে বিয়ে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুইডেনও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার পথে রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্য আইন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিবর্তে এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং বিয়ের আগে ‘জেনেটিক কাউন্সেলিং’ বা জিনগত পরীক্ষা করানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
আধুনিক শিক্ষা ও সচেতনতার বিস্তারের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বোঝাপড়া এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সতর্কতাকে গুরুত্ব দিয়ে অনেক তরুণ-তরুণী আত্মীয়তার বাইরে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার দিকে আগ্রহী হচ্ছেন।
সূত্র: বিবিসি
