জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড, ঝুঁকিতে প্রবীণ জনগোষ্ঠী
ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাবে গত মে ও জুন মাসে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকরা বলছেন, অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা শুধু সরাসরি হিট স্ট্রোকের কারণই নয়, বরং হৃদ্রোগ ও শ্বাসতন্ত্রজনিত জটিলতা বাড়িয়ে মৃত্যুঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। একই সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও গবেষণা সংস্থার তথ্য ইঙ্গিত করছে।
গবেষণা প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রস্তুত করেছে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিশেষজ্ঞরা। তারা আবহাওয়ার উপাত্ত, জলবায়ু মডেল এবং অতিরিক্ত মৃত্যুহারের বিভিন্ন গবেষণা বিশ্লেষণ করে এই অনুমান প্রকাশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের মে ও জুন মাসে ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চল দুটি ব্যতিক্রমী তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হয়। এর ফলে ইংল্যান্ডে মে মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং জুনে ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে নতুন মাসিক রেকর্ড সৃষ্টি করে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুনের শেষ ভাগে পশ্চিম ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত এই তাপপ্রবাহের সময় বিভিন্ন দেশে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি ছিল। ইউরোপীয় স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক ইউরোমোমোর তথ্য বলছে, এই অতিরিক্ত মৃত্যুর মধ্যে ৯ হাজারের বেশি মানুষের বয়স ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত তাপদাহের সময় প্রবীণ, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত এবং দুর্বল শারীরিক অবস্থার মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তাপপ্রবাহের কারণে শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হৃদ্রোগ ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডেনমার্কের স্ট্যাটেন্স সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান চিকিৎসক লাসে ভেস্টারগার্ডের মতে, বছরের এই সময় এত বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তাঁর ভাষায়, তীব্র তাপপ্রবাহ ছাড়া এমন উচ্চ মৃত্যুহার ব্যাখ্যা করা কঠিন।
জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, সাম্প্রতিক এই তাপপ্রবাহ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবেরই অংশ। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না হলে জুনের শেষ ভাগের এই তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি প্রায় অসম্ভব ছিল।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্ক ম্যাকার্থি বলেন, বছরের এত শুরুর দিকে এমন চরম তাপপ্রবাহ দেখা দেওয়া সময়গত দিক থেকেও অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। এটি পশ্চিম ইউরোপের প্রায় সব অঞ্চলের জন্যই বড় ধরনের আবহাওয়াগত সতর্কসংকেত।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সরকারি মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে তাপপ্রবাহ-সম্পর্কিত মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করবে। তবে গবেষকদের ধারণা, চূড়ান্ত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি কৃষি, জ্বালানি খাত, কর্মক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ইউরোপের দেশগুলোকে ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজন পরিকল্পনা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ ইউরোপে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এমন প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে, যা জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
