সিএনএন
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শেষ হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও সামরিক স্থাপনা কমানোর কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। ছয়টি সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, সংঘাতের অবসান হলে আগামী বছর থেকেই সেনা ও সামরিক স্থাপনা কমানোর কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নীরবে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন।
এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এটি হবে বড় পরিবর্তন। গত ২৫ বছরে অঞ্চলটি থেকে মার্কিন উপস্থিতি কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সংঘাত এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ওই অঞ্চলে ফিরিয়ে এনেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ৫০ হাজার সেনা রয়েছে। পাশাপাশি দুটি বিমানবাহী রণতরি ও এক ডজনের বেশি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ বিপুল সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন আছে।
তবে ইরানের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতে এসব সামরিক স্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একাধিক মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কতটা সামরিক উপস্থিতি থাকবে, তা নিয়ে কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু স্থাপনা পুনর্নির্মাণ না করা এবং স্থায়ী ঘাঁটি ছাড়াই কিছু স্পর্শকাতর অভিযান পরিচালনার বিষয় রয়েছে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা বাড়াতে কিছু সামরিক স্থাপনা মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ার পর এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, এসব দুর্বলতা আগে থেকেই জানা ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে যথেষ্ট জরুরি পদক্ষেপ নেয়নি।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী বছর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েনের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য সামরিক বাহিনী কয়েকটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তবে ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলমান থাকায় বিমান হামলা পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো এখনই ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ভবিষ্যতে সেনা মোতায়েনের কাঠামো নিয়ে অনুমান করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। সিআইএও এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়। ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ এবং পরে অঞ্চলজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য স্থায়ী ঘাঁটি ও গোয়েন্দা স্থাপনার বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে যুক্তরাষ্ট্র।
নাইন–ইলেভেনের দুই বছর পর ইরাকে আগ্রাসনের সময় মধ্যপ্রাচ্যে আনুমানিক ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন সেনা ছিল। উন্মুক্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা কখনো এক লাখের নিচে নামেনি।
২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আফগানিস্তান থেকে সেনা কমানোর ঘোষণা দেন এবং ইরাক থেকেও যুদ্ধরত সেনা প্রত্যাহার করেন। পরে ইরাকে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের উত্থান হলে আবার মার্কিন সেনা পাঠানো হয়। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনার সংখ্যা ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজারের মধ্যে ওঠানামা করেছে।
একই সময়ে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলাও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সামরিক উপস্থিতি কমানোর পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন নয়। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও ইতিহাসবিদদের মতে, নাইন–ইলেভেনের সময় সিআইএ নতুন ধরনের মিশনের সন্ধান করছিল। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ায় সংস্থাটির প্রধান প্রতিপক্ষও আর আগের মতো ছিল না।
নাইন–ইলেভেনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সিআইএ ব্যাপকভাবে জনবল নিয়োগ করে এবং বড় একটি আধা সামরিক কর্মকর্তাদল গড়ে তোলে। তাঁরা অস্ত্র বহন করতেন এবং সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন।
পরবর্তী দুই দশকে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের প্রেসিডেন্টই বিভিন্ন সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। ওবামা এশিয়ায় মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের প্রশাসনও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
কিন্তু আইএসের অপ্রত্যাশিত উত্থান এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শীর্ষ ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার মতো ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় করে।
ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা ও সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের রিয়াদে সিআইএর একটি ঘাঁটি ইরানের হামলায় কার্যত ধ্বংস হয়েছে।
বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতেও মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কিছু স্থাপনা পুনর্নির্মাণ না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এর সঙ্গে সম্ভাব্য ব্যয়ের বিষয়টি জড়িত।
গত এপ্রিলে পেন্টাগনের শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা তৃতীয় জুলস জে হার্স্ট জানিয়েছিলেন, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা মেরামতে কত ব্যয় হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান কী হবে, তার মূল্যায়নের ওপরও বিষয়টি নির্ভর করবে।
আলোচনার বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে মার্কিন সেনা কমাতে আগ্রহী। একই সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতিরক্ষার আরও বেশি দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো পর্যালোচনা শুরু হয়নি। সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্রুত অবস্থান পরিবর্তনের প্রবণতা বিবেচনায় রেখে সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন যে ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ানোর সামরিক পদক্ষেপ তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সম্ভবত সফল হবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তবে এ কৌশল ফল দিতে কত সময় লাগতে পারে, তার কোনো স্পষ্ট সময়সীমা নেই। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব কয়েক মাসের অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার জন্য প্রস্তুত এবং নিকট ভবিষ্যতে তাদের আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা কম।
পেন্টাগনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ও স্থায়ী কিছু সামরিক ঘাঁটি রাখা হবে। তবে এসব স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করা হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলো পুনর্নির্মাণের ব্যয়ে কতটা অংশ নিতে আগ্রহী, তার ওপর নির্ভর করতে পারে। আলোচনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র জানিয়েছে, এ ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার হতে পারে।
স্বল্প মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সেনা ও ঘাঁটিগুলো ইরানের অব্যাহত হামলার মুখে পড়তে পারে। গত সপ্তাহে মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাহরাইনে পঞ্চম নৌবহরের ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা শিগগিরই ফিরছেন না।
