রামগতি-কমলনগরে হাতবদলে বাড়ছে ইলিশের দাম, ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত জেলেরা
লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগরে মেঘনার ইলিশ জেলেদের কাছ থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে কয়েক দফা হাতবদল হচ্ছে। এতে মাছের দাম বেড়ে জেলেদের পাওয়া দামের তিন থেকে চার গুণে উঠছে। স্থানীয় জেলে ও ভোক্তাদের অভিযোগ, দাদন ব্যবসায়ী, আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যস্বত্বভোগী একটি শক্তিশালী চক্র ইলিশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে জেলেরা ন্যায্য দাম না পেলেও চড়া দামে মাছ কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
মেঘনার ইলিশ স্বাদ ও গুণের কারণে দেশের ক্রেতাদের কাছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। নদী থেকে জেলেদের জালে ধরা পড়ার পর মাছঘাটের আড়ত, ব্যাপারী, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে তা ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, জেলে থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগে ইলিশ অন্তত পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে। প্রতিটি ধাপেই দাম বাড়ে।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কমলনগরে ১৪ হাজার এবং রামগতিতে ২০ হাজার নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। মাছ কেনাবেচার জন্য কমলনগরে ছয়টি ও রামগতিতে ১০টি মাছঘাট রয়েছে। মেঘনায় ধরা ইলিশ প্রথমে এসব ঘাটে ওঠে এবং নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি শুরু হয়।
স্থানীয় মাছঘাটগুলো ঘুরে জানা গেছে, ইলিশ সাধারণত ওজনের ভিত্তিতে নয়, বরং হালি বা পিস হিসেবে নিলামে বিক্রি হয়। ফলে জেলেদের কাছ থেকে যে দামে মাছ কেনা হয়, পরবর্তী ধাপগুলোতে একই মাছের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন ঘাটের আড়তে এক কেজি ওজনের ইলিশ বর্তমানে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন তারা। একই মাছ হাতবদল হয়ে ভোক্তার কাছে বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায়।
রামগতির বয়ারচর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রেও একই ধরনের দামের ব্যবধান দেখা গেছে। সেখানে এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ জেলের কাছ থেকে প্রথমে ১ হাজার ২০০ টাকায় নেওয়া হয়। পরে আড়তে এর দাম ওঠে ২ হাজার টাকা। শেষ পর্যন্ত লোকমান হোসেন নামের এক ভোক্তা মাছটি ৪ হাজার টাকায় কেনেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক ধাপে হাতবদলের মাধ্যমে যুক্ত হওয়া অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের লাভ হিসেবে চলে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেঘনায় ইলিশ শিকারে যাওয়া অনেক জেলে আড়তদার বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আগাম টাকা নেন। ফলে মাছ ধরার পর কোথায় এবং কী দামে বিক্রি হবে, সে বিষয়ে জেলেদের স্বাধীনতা অনেকটাই সীমিত থাকে। মাছঘাটে পৌঁছানোর পর দাম নির্ধারণে দাদনদাতাদের প্রভাব থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আলেকজান্ডার সেন্টার ঘাটের জেলে হাসিম মাঝি বলেন, ‘দিনের পর দিন, মাসের পর মাস রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ইলিশ শিকার করি। কষ্টের সেই ইলিশ নামমাত্র মূল্যে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছি। সিন্ডিকেট অতিক্রম করার কোনো সুযোগ আমাদের থাকে না।’
জেলে নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘একটা ট্রলার নিয়ে নদীতে গেলে দুই লাখ টাকার ওপর খরচ হয়। এই টাকা আগে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে নিতে হয়। তাই তাদের কথামতো ইলিশ শিকার করে তাদের হাতে তুলে দিতে হয়।’
মৎস্যজীবী সমিতির নেতাদের মতে, জেলেদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা এবং দাদননির্ভরতা কমানো গেলে ইলিশের বাণিজ্যে স্বচ্ছতা বাড়বে। এ জন্য সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ব্যবস্থা এবং মাছঘাটে নিয়মিত সরকারি নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তারা।
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির কমলনগর উপজেলা সভাপতি এ বি এম ছিদ্দিক ফকির বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং মৎস্য অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মেঘনার ইলিশের ওপর এ এলাকার হাজার হাজার জেলে পরিবার নির্ভরশীল। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপে আড়তদার, পাইকার, দাদন ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা যুক্ত হওয়ায় জেলে ও ব্যবসায়ীদের আয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) উপজেলা সম্পাদক বেলাল হোসেন জুয়েলের দাবি, দেশীয় মাছ চাষে পুকুর, পোনা, খাদ্য ও পরিচর্যায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলেও ইলিশের উৎপাদনে এমন ব্যয় নেই। তাঁর মতে, ইলিশের উচ্চমূল্যের পেছনে বাজার ব্যবস্থাপনার কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, জেলেদের জালে আশানুরূপ ইলিশ না পড়ায় বর্তমানে দাম কিছুটা বেশি। তবে অল্প সময়ের মধ্যে ইলিশের পরিমাণ বাড়বে এবং তখন দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, মাছঘাটে ইলিশ বিক্রির পর পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে মাছটি। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে মৎস্য বিভাগ কাজ করছে।
