ফসলের জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের সিদ্ধান্তে দেশের বড় অংশের কৃষক এখনো খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারদের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশের বেশি কৃষক কীটনাশক ব্যবহারের নির্দেশনা নেন তাঁদের কাছ থেকে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কৃষক সুপারিশের তুলনায় বেশি ঘনত্বে কীটনাশক প্রয়োগ করেন। এমনকি জরিপে অংশ নেওয়া কৃষকদের একটি অংশ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ কীটনাশকও ব্যবহার করছেন।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের গবেষকেরা টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের ৬০০ কৃষকের ওপর জরিপটি পরিচালনা করেন। ২০২৫ সালের চাষ মৌসুমে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। কৃষকদের পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর কীটনাশকের প্রভাব মূল্যায়ন করাই ছিল গবেষণার উদ্দেশ্য।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার বারাকান্দী গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলামের অভিজ্ঞতা এ পরিস্থিতির একটি উদাহরণ। জমিতে পোকা দেখা দিলে তিনি স্থানীয় কীটনাশকের দোকানে গিয়ে পরামর্শ নেন। কোন ওষুধ ব্যবহার করবেন, কী পরিমাণে প্রয়োগ করবেন এবং কতবার স্প্রে করবেন—এসব বিষয়ে সাধারণত দোকানদারের কথাই অনুসরণ করেন তিনি।
শহিদুলের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত পরামর্শ বা তদারকি না পাওয়ায় দ্রুত সমাধানের জন্য তাঁকে কীটনাশকের দোকানে যেতে হয়। এমনকি কীটনাশক প্রয়োগের এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই অনেক সময় তিনি শাকসবজি তুলে বাজারে নিয়ে যান।
তাঁকে পরামর্শ দেওয়া বিক্রেতা মোহাম্মদ সোনাউল্লার নিজের কীটনাশক বিক্রির লাইসেন্স নেই। তিনি অন্য একজনের লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যবসা করেন। কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণও তাঁর নেই।
সোনাউল্লা জানান, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি কৃষকদের কীটনাশক নির্বাচন ও প্রয়োগের পরামর্শ দেন। তবে নিরাপদ মাত্রা, ফসল তোলার আগে নির্ধারিত অপেক্ষাকাল বা বাংলাদেশে নিষিদ্ধ কীটনাশক সম্পর্কে তাঁর পরিষ্কার ধারণা নেই।
গবেষণায় দেখা যায়, কীটনাশকের গায়ে থাকা নির্দেশনা অনুসরণ করেন মাত্র প্রায় ১৯ শতাংশ কৃষক। প্রায় ১২ শতাংশ নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কীটনাশক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ কৃষক নিরাপদ মাত্রা অনুসরণ করে কীটনাশক প্রস্তুত করেন। বিপরীতে প্রায় ৭৫ শতাংশ কৃষক সুপারিশের চেয়ে বেশি ঘনত্বে তা ব্যবহার করেন। সিরাজগঞ্জে এ হার প্রায় ৬৯ শতাংশ।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে। টাঙ্গাইলে জরিপে অংশ নেওয়া ১২ শতাংশ এবং সিরাজগঞ্জের ২০ শতাংশ কৃষক বাংলাদেশে নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার করছেন। সিরাজগঞ্জে প্রায় ৩ শতাংশ কৃষক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তালিকাভুক্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক শ্রেণির কীটনাশক ব্যবহার করেন।
কৃষিবিদদের মতে, বালাই নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ হতে পারে। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগের ফলে এটি কৃষক, পরিবেশ এবং ভোক্তার জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দেশে কীটনাশক বিক্রির লাইসেন্স প্রদান ও তদারকির দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৯০০ ব্র্যান্ডের ৩২৭ ধরনের কীটনাশক নিবন্ধিত রয়েছে। খুচরা ডিলারের সংখ্যা প্রায় ৬৮ হাজার এবং পাইকারি ডিলার প্রায় ৫ হাজার ৭০০।
মাঠপর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে উপজেলা পর্যায়ে তিনজন এবং জেলা পর্যায়ে একজন কর্মকর্তা পেস্টিসাইড ইন্সপেক্টর হিসেবে কাজ করেন। ফলে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে গড়ে প্রায় ৪৪ জন খুচরা ডিলার তদারকি করতে হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, নিয়মিত কৃষক প্রশিক্ষণে কীটনাশক ব্যবহারের সতর্কতা সম্পর্কে জানানো হয়। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার দায়িত্ব কৃষকের।
তবে প্রতিটি কৃষকের বাড়িতে নিয়মিত গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মতো পর্যাপ্ত জনবল মাঠপর্যায়ে নেই বলেও জানান তিনি।
অনুমোদন ছাড়া কীটনাশক বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে ওবায়দুর রহমান বলেন, প্রশাসনের সহায়তা ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একার পক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়।
কীটনাশক প্রয়োগের পর ফসল বাজারজাত করার আগে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়কে ‘উইথহোল্ডিং পিরিয়ড’ বলা হয়। এ সময় শেষ হওয়ার আগে ফসল বাজারজাত না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৪১ শতাংশ কৃষক এই অপেক্ষাকাল সম্পর্কে জানেন। তাঁদের মধ্যেও প্রায় ৩৯ শতাংশ মনে করেন, নিয়মটি মানা বাধ্যতামূলক নয়। প্রায় এক-চতুর্থাংশ কৃষকের ধারণা, নির্ধারিত সময়ের আগেই ফসল সংগ্রহ করলেও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয় না।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অপেক্ষাকাল সম্পর্কে সচেতন বলে দাবি করা কৃষকদের মধ্যেও অনিরাপদ ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকার পেছনে শুধু অপেক্ষাকাল না মানাই দায়ী নয়। কীটনাশকের মান, মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ এবং একাধিক কীটনাশক একসঙ্গে ব্যবহারের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি পর্যায়ে কীটনাশকের মান পরীক্ষা নিয়ে ঘাটতি থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
কীটনাশকের ক্ষতি শুধু ভোক্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরাসরি স্প্রে করার কারণে কৃষকরাও নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
গবেষণায় অংশ নেওয়া সিরাজগঞ্জের কৃষকদের অর্ধেকের বেশি কীটনাশক ব্যবহারের পর ত্বকে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন। অথচ স্প্রে করার সময় নিয়মিত গ্লাভস, মাস্ক বা অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন মাত্র ১৯ শতাংশ কৃষক।
এ ছাড়া প্রায় ৬৩ শতাংশ কৃষক কীটনাশক ছিটানোর সময় বাতাস কোন দিক থেকে বইছে, তা বিবেচনায় নেন না।
কীটনাশক নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্স ইন্টারন্যাশনালের (সিএবিআই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৯ হাজার মেট্রিক টন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এর ব্যবহার প্রতিবছরই বাড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, দেশে কৃষিপণ্যে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। দীর্ঘদিন কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই এর সংস্পর্শে থাকায় দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, গ্যাস্ট্রিক, লিভারের সমস্যা, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার ও চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে কীটনাশকের সম্পর্ক থাকতে পারে।
টেকসই কৃষি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বালাইনাশকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সম্প্রতি ১৯ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
কমিটির সদস্য সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন বলেন, কীটনাশক নিজেই বিষাক্ত পদার্থ। তবে জাতীয় বিধিমালা অনুযায়ী এতে ভারী ধাতু বা তেজস্ক্রিয় উপাদানের মতো ক্ষতিকর পদার্থ থাকার কথা নয়।
তিনি বলেন, কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আমদানি করা কীটনাশকের মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার এবং দেশে কীটনাশক উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কৃষকের হাতে কীটনাশক ব্যবহারের সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া, বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো না গেলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
