প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ‘ন্যানো সেল’ গঠন বিসিআইসির, ব্রি-বারি-বিনায় চলছে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা
বিশ্বজুড়ে সারের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় কমাতে ন্যানো প্রযুক্তিনির্ভর সারের ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। কৃষকের খরচ কমানোর পাশাপাশি রাসায়নিক সারের আমদানিনির্ভরতা ও সরকারি ভর্তুকির চাপ কমানোই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃষিতে ন্যানো ফার্টিলাইজারের গুরুত্ব তুলে ধরেন। মাটির উর্বরতা রক্ষা, সারের কার্যকর ব্যবহার এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে ন্যানো সারের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণা জোরদার ও দ্রুত মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের নির্দেশনা দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ন্যানো সার নিয়ে গবেষণা, বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারণের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ন্যানো সার নিয়ে পাইলট প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বিশেষ ‘ন্যানো সেল’ গঠন করেছে।
দেশের সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ন্যানো সারের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালিয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণায় বাংলা মার্কের ‘ইফকো ন্যানো ইউরিয়া’ ও ‘এন ব্লু’ সার নিয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এসব গবেষণার ফল বিভিন্ন জার্নাল ও গবেষণা সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়েছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা মার্ক কেমিক্যাল লিমিটেডও গত পাঁচ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ন্যানো ইউরিয়া, ন্যানো ডিএপি, ন্যানো এমওপি ও ন্যানো এনপিকে নিয়ে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। ধান, গম, শাকসবজি ও আমসহ বিভিন্ন ফসলের ওপর পরিচালিত এসব পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়ার দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্বের কৃষি খাতে গত কয়েক বছর ধরে ন্যানো প্রযুক্তিনির্ভর সারের ব্যবহার বাড়ছে। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো কৃষিপ্রধান দেশেও এ প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে।
আফ্রিকার সেনেগাল, কেনিয়া ও উগান্ডায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং কম খরচে উৎপাদনের লক্ষ্যে ন্যানো সার ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউরোপের ইতালি, স্পেন ও জার্মানিতেও পরিবেশবান্ধব কৃষিতে এর ব্যবহার বাড়ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে ন্যানো ইউরিয়া, ন্যানো ডিএপি, ন্যানো এমওপি ও ন্যানো এনপিকে ব্যবহারের বিস্তার ঘটেছে।
বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের গবেষণায় এসব দেশে ন্যানো সার ব্যবহারে ফলন বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমার কথা উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার আমদানি করতে হয়। তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ইউরিয়ার চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন। এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় প্রায় ১০ লাখ টন। ফলে ঘাটতি মেটাতে প্রায় ১৬ লাখ টন ইউরিয়া আমদানি করতে হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী এই সার কিনতে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। কৃষকদের তুলনামূলক কম দামে সার দিতে সরকারকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়।
ন্যানো সার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে আমদানিনির্ভরতা ও ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রচলিত দাবির হিসাবে, ৫০০ মিলিলিটারের একটি ন্যানো ইউরিয়ার বোতল ৫০ কেজি দানাদার ইউরিয়ার সমপরিমাণ কাজ করতে পারে, আর এর ব্যবহার খরচও তুলনামূলক কম।
অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির উপকারী অণুজীব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরিয়া ও অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান জলাশয়ে গিয়ে পানির গুণমানও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ন্যানো সারের ক্ষেত্রে উদ্ভিদের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি উপাদান সরবরাহের সুযোগ থাকায় সারের অপচয় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে কৃষিজমি ও জলাশয়ের ওপর রাসায়নিক দূষণের চাপও কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
গ্যাস-সংকট, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতার কারণে দেশে বিভিন্ন সময়ে সার সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে ন্যানো ফার্টিলাইজারকে বিকল্প প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।
তবে মাঠপর্যায়ে বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারের আগে গবেষণার ফল, কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকের জন্য বাস্তব খরচ—সব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন। গবেষণা ও পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে ন্যানো সারের বাণিজ্যিক ব্যবহার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও সরকারের ভর্তুকির চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
