সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাইটেক পার্কটি চালুর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের দেখা মিলছে না। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকায় প্লট বরাদ্দ পাওয়া আটটি প্রতিষ্ঠান কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেনি। ভবনে জায়গা বরাদ্দ পাওয়া পাঁচ প্রতিষ্ঠানও এখনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু করতে পারেনি। ফলে ১৭১.৭ একর জমির এই পার্কের অর্ধেকের বেশি এলাকা এখনো খালি পড়ে আছে।
সিলেট অঞ্চলে ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং ৪০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে হাইটেক পার্কটি গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩০০ কোটি টাকা এবং কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪০০ মানুষের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্ণি এলাকায় ১৭১.৭ একর জমিতে নির্মিত পার্কটির অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ শেষ হয় ২০২৩ সালে। এর আগে ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল।
হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নয়টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৪.৮৭ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে র্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেড ৩২ একর, হেলথ ল্যান্ডমার্ক হোল্ডিং লিমিটেড ১.৫ একর, রহমানিয়া সুপার মার্কেট ১ একর, টুগেদার আইটি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১ একর, ইনোটেক হোল্ডিং লিমিটেড ৩.৪২ একর, ইএলবি লিমিটেড ১ একর, আইরিশ ইলেকট্রনিক লিমিটেড ১.৮ একর, বঙ্গো টেকনোলজি লিমিটেড ১.৪ একর এবং এডিএন টেলিকম লিমিটেড ১.৭৫ একর জমি পেয়েছে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুধু র্যাংগস ইলেকট্রনিকস কারখানা স্থাপন করে উৎপাদনে গেছে। এডিএন টেলিকমের কারখানা স্থাপনের কাজ চলছে। হেলথ ল্যান্ডমার্ক হোল্ডিং, রহমানিয়া সুপার মার্কেট ও টুগেদার আইটি ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাথমিক নির্মাণকাজ শুরু করলেও দীর্ঘদিন ধরে তা বন্ধ রয়েছে। আর ইনোটেক হোল্ডিং, বঙ্গো টেকনোলজি, আইরিশ ইলেকট্রনিক ও ইএলবি কারখানা স্থাপনের কাজই শুরু করেনি।
পার্কের ভবনে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১৯ হাজার ৬২ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড পেয়েছে ৩ হাজার ৮২৮ বর্গফুট, মেসার্স আব্দুল বাছির এন্টারপ্রাইজ ২ হাজার ২৬০ বর্গফুট, বাহন ইকোমোবাইল লিমিটেড ২ হাজার ৯২২ বর্গফুট, ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড ৬ হাজার ৩৬ বর্গফুট এবং আপস্কিল বাংলাদেশ ৪ হাজার ১৬ বর্গফুট জায়গা পেয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শুধু আপস্কিল বাংলাদেশের ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিনিয়োগ না আসায় পার্কে আরও ৭৬ একর জমি এবং ২ হাজার ৫১৪ বর্গফুট জায়গা এখনো খালি রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়টিও বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
হাইটেক পার্কে আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার, প্রশাসনিক ভবন, ৩৩ কেভি লাইনের ১০ মেগাওয়াট বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস স্টেশন, ইউটিলিটি ভবন, আনসার ব্যারাক, অভ্যন্তরীণ সড়ক, সেতু, গেস্ট হাউস এবং কালভার্ট কাম স্লুইসগেট রয়েছে।
তবে সরেজমিনে পার্কের ভেতরে শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়নি। কোথাও যন্ত্রপাতির শব্দ নেই, নেই কর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতিও।
পার্কের সীমানা এলাকায়ও অবকাঠামোগত সমস্যার চিত্র রয়েছে। নদীতে সীমানাপ্রাচীরের মাটি বিলীন হয়েছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে বিভিন্ন স্থানে দেয়াল ধসে পড়েছে। প্রায় এক কিলোমিটার সীমানা উন্মুক্ত ও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। অভ্যন্তরীণ সড়কের বিভিন্ন অংশের কার্পেটিং উঠে গেছে এবং বেশ কিছু কালভার্টের কাজও অসম্পূর্ণ।
বিনিয়োগের স্থবিরতার মধ্যেও র্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেড পার্কটিতে উৎপাদন শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩০ শতাংশ জনবল নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে ওই জনবলের সবাই নিয়মিত ও প্রশিক্ষিত নয়; তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে।
র্যাংগস ইলেকট্রনিকসের ডিজিএম প্রকৌশলী মো. মোরশেদুল আলম বলেন, ‘নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বিনিয়োগ করেছে র্যাংগস ইলেকট্রনিকস। পুরোদমে উৎপাদনে যেতে না পারলেও গড়ে তিন শতাধিক জনবল এখানে কাজ করছেন। এখানে মূল সংকট হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিরাপত্তার অভাব। এছাড়া সিলেটের যোগাযোগব্যবস্থাও বিনিয়োগে অনাগ্রহ তৈরি করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিলেট হাইটেক পার্কের এখনও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এখানে উৎপাদিত ইলেকট্রনিকস পণ্য দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সহজেই পাশের দেশ ভারতের সাতটি রাজ্যের বাজারে আধিপত্য তৈরি করতে পারে। তাতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে তৈরি হবে বিপুল কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ জনবল।’
প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিলেট হাইটেক পার্কের সহকারী পরিচালক এস এম আল মামুন বলেন, ‘আমরা বলি একভাবে, আপনারা লিখেন আরেকভাবে। এজন্য ফোনে আপনার প্রশ্নের কোনো উত্তর দেব না। আপনার কিছু জানার থাকলে লিখিত আকারে দেন, তখন বিষয়টি দেখব।’
পরে লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে হাইটেক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো প্রকল্পসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদনেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। সেখানে দ্রুত গ্যাস সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বাসস্টপেজ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে আমরা বৈদেশিক শ্রমবাজারে আধিপত্য বৃদ্ধি করতে চাই। এজন্য দরকার উপযুক্ত ট্রেনিং সেন্টার। নতুন ট্রেনিং সেন্টার বানাতে সময় লাগবে। এখানে একটি প্রায় মৃত প্রকল্প পড়ে আছে। ভাষা ও কার্যদক্ষতায় প্রশিক্ষিত তরুণ জনবল তৈরি করতে এই অবকাঠামোগুলোকে আমরা কাজে লাগাতে চাই।’
সিলেট হাইটেক পার্ক চালুর আগে যে বড় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চয়তা এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সমস্যায় তা এখনো পূরণ হয়নি। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই শিল্পাঞ্চলকে কার্যকর উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সংকট দূর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
