জর্ডানে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার পর ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের সামরিক পদক্ষেপ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আল জাজিরা ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার জর্ডানে ইরানি হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর রোববার ভোরে ইরানের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হামলায় উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা, সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলায় জড়িত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-সংশ্লিষ্ট বাহিনীকেও লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্ভাব্য হুমকি কমানো এবং মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার জবাব দিতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক রেসুল সারদার আতাস জানান, দক্ষিণ ইরানকে দেশের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশলের অংশ হিসেবেই এসব হামলা পরিচালিত হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সেতু, রেলপথ, সড়ক, বিমানবন্দর ও টানেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের চলাচল এবং পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু হাসপাতাল খালি করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা স্থগিত করার খবরও পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, কিশ দ্বীপের আকাশে যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা গেছে এবং সিরিক শহরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস ও নিকটবর্তী কেশম দ্বীপেও একাধিক হামলার খবর পাওয়া গেছে। মেহর ও তাসনিম সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কেশম দ্বীপের উপকণ্ঠে অন্তত ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
এদিকে ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা কুয়েতে অবস্থিত দুটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় বড় আকারের ড্রোন হামলা চালিয়েছে। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ক্যাম্প আল-আদিরির গোলাবারুদ ডিপো এবং আলী আল সালেম বিমানঘাঁটির আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা। তবে কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলা করেছে।
বাহরাইনেও রোববার বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিক ও বাসিন্দাদের শান্ত থাকার পাশাপাশি নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানায়।
ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জর্ডানে দুই সেনার মৃত্যুকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, “ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।”
অপরদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন তাদের সঙ্গে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক বারবার লঙ্ঘন করেছে এবং এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভোলার নয় এমন শিক্ষা’ পেতে হবে। একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদরদপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহিও। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব হবে কঠোর ও বিধ্বংসী।
নতুন এই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
