জরিপের দাবি নিয়ে কেন্দ্র ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে ব্যাখ্যা চাইল এলাহাবাদ হাইকোর্ট
ভারতের ঐতিহাসিক স্থাপনা তাজমহলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। এলাহাবাদ হাইকোর্ট সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার ও ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (এএসআই)-এর কাছে জানতে চেয়েছে, তাজমহলের নিচে কোনো প্রাচীন মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে কি না তা অনুসন্ধানের জন্য জরিপ পরিচালনায় বাধা কোথায়। আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর দেশটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
সোমবার অনুষ্ঠিত শুনানিতে আদালত একটি পুরোনো মামলার প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্ন তোলে। মামলাটি মূলত তাজমহল প্রাঙ্গণে স্থাপত্যগত ও ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের জন্য জরিপ পরিচালনার অনুমতি চেয়ে করা হয়েছিল। এর আগে নিম্ন আদালত এমন আবেদন খারিজ করেছিল।
মামলার আবেদনকারীরা দাবি করছেন, বিশ্বখ্যাত তাজমহল আসলে ‘তেজো মহালয়া’ নামে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির ছিল, যা ভগবান শিবের উদ্দেশে নির্মিত হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ, পরবর্তীকালে মোগল আমলে স্থাপনাটির রূপ পরিবর্তন করে বর্তমান তাজমহলে রূপান্তর করা হয়।
এই দাবির ভিত্তিতে তারা আদালতের কাছে তাজমহলের বিভিন্ন অংশে ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি এবং বিস্তারিত জরিপ পরিচালনার অনুমতি চেয়েছেন, যাতে স্থাপনাটির প্রকৃত ঐতিহাসিক পরিচয় নির্ধারণ করা যায়।
এলাহাবাদ হাইকোর্ট শুনানিকালে প্রশ্ন তোলে, যদি কোনো পক্ষ ঐতিহাসিক দাবি যাচাই করতে চায়, তাহলে জরিপ পরিচালনায় আপত্তির কারণ কী। আদালত এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআইকে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে নোটিশ জারি করেছে।
তবে আদালত এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং পরবর্তী শুনানিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য বিবেচনা করা হবে।
মামলার আবেদনকারীদের মতে, তাজমহল প্রাঙ্গণে হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিভিন্ন চিহ্ন রয়েছে এবং সেগুলো যাচাই করা প্রয়োজন। তারা আদালতের মাধ্যমে একটি ঘোষণামূলক আদেশও চেয়েছেন, যাতে স্থাপনাটিকে হিন্দু মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সেখানে পূজার অনুমতি নিশ্চিত করা হয়।
তাদের আরও দাবি, তাজমহলের কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া প্রকৃত তথ্য জানা সম্ভব নয়।
ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদদের বৃহৎ অংশের মতে, তাজমহল মোগল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৬৩১ সালে এবং প্রায় দুই দশক ধরে চলার পর সম্পন্ন হয়।
ভারত সরকারের পর্যটনবিষয়ক তথ্যভান্ডার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কোর নথিতেও তাজমহলকে মোগল স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি বর্তমানে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানের মর্যাদা ভোগ করছে।
ভারতের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এই বিতর্ক অনেকের কাছে বাবরি মসজিদ–রামমন্দির বিরোধের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। সেই বিরোধও কয়েক দশক ধরে আদালতে চলার পর শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, তাজমহল নিয়ে বর্তমান মামলাটি কেবল একটি ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক বিতর্ক নয়; এটি ধর্ম, ইতিহাস এবং রাজনীতির সংবেদনশীল প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত।
তাজমহল শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম পরিচিত স্থাপত্য নিদর্শন। প্রতিবছর দেশি-বিদেশি লাখো পর্যটক এই স্মৃতিসৌধ দেখতে আগ্রায় যান। ফলে এ ধরনের বিতর্কের প্রভাব শুধু বিচারিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; পর্যটন শিল্প, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক গবেষণা, প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য এবং আদালতের পর্যবেক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাজমহলকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্থাপিত মন্দির-সংক্রান্ত দাবি ভারতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আদালতের নির্দেশে ভবিষ্যতে জরিপের অনুমতি দেওয়া হবে কি না এবং এ বিষয়ে সরকার ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অবস্থান কী হবে, তা এখন সবার নজরে। তবে আপাতত বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
