গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে খাদ্যাভ্যাসে ছোট পরিবর্তনেই মিলতে পারে বড় উপকার
তাপমাত্রা যখন ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে যায়, তখন শুধু পরিবেশই নয়, মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন দেখা দেয়। অতিরিক্ত গরমে অনেকেরই ক্ষুধা কমে যায়, রান্নাঘরে দীর্ঘ সময় কাটানোও হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর। এমন পরিস্থিতিতে শরীরকে সুস্থ ও সতেজ রাখতে কী ধরনের খাবার বেছে নেওয়া উচিত এবং কোন অভ্যাসগুলো উপকারী হতে পারে—সেই বিষয়ে পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহের সময় শরীরের জন্য অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং প্রোটিনসমৃদ্ধ অনেক খাবার, যেমন মাংস, মাছ বা মুরগি রান্না করতে অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয়, যা গরম আবহাওয়ায় অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া প্রোটিন হজমের সময় শরীরের ভেতরেও তুলনামূলক বেশি তাপ উৎপন্ন হয়। ফলে ভারী মাংসজাতীয় খাবার খাওয়ার পর শরীরে গরম অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য বিকল্প হিসেবে ডাল, বাদাম, টোফু, দুধ, পনির, ডিম এবং গ্রিক ইয়োগার্টের মতো খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা শিম বা ডালের সালাদ, হালকা মাছ, আগে থেকে রান্না করা মাংস এবং ফল-দইয়ের স্মুদি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
গরমে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি বের হয়ে যায়। এ কারণে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু পানি পান করাই যথেষ্ট নয়; খাদ্যতালিকায় পানি-সমৃদ্ধ ফল ও শাকসবজিও রাখতে হবে।
পুষ্টিবিদদের মতে, শসা, টমেটো, লেটুস, সেলারি, তরমুজ ও স্ট্রবেরির মতো খাবারে ৯০ শতাংশেরও বেশি পানি থাকে। একইভাবে কমলা, আঙুর, নাশপাতি, আনারস, আপেল এবং গাজরও শরীরের পানির ঘাটতি পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরে পানির মাত্রা ঠিক আছে কি না, তা প্রস্রাবের রঙ দেখে অনেকাংশে বোঝা যায়। হালকা হলুদ রঙ সাধারণত স্বাভাবিক পানিশূন্যতামুক্ত অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে গাঢ় হলুদ বা বাদামি রঙ দেখা গেলে তা ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ হতে পারে।
অনেকের ধারণা, তাপপ্রবাহে শুধুই ঠান্ডা পানীয় পান করা উচিত। তবে গবেষণা বলছে, কুসুম গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানীয়ও শরীরকে ঠান্ডা রাখতে কার্যকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গরম পানীয় পান করলে শরীর দ্রুত ঘাম তৈরি করে এবং সেই ঘাম বাষ্পীভূত হওয়ার মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত তাপ বের হয়ে যায়। ফলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য হয়।
তবে পানীয় গরম না ঠান্ডা—তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করা। চা বা কফি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে অতিরিক্ত ক্যাফেইন শরীর থেকে পানি বের করে দিতে পারে। তাই পরিমিত পরিমাণে কফি বা চা পান করাই উত্তম।
গরমের দিনে খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি দৈনন্দিন রুটিনেও কিছু পরিবর্তন আনা উপকারী হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা দিনের শুরুতে হালকা ও পুষ্টিকর নাশতা, দুপুরের তীব্র গরমে বিশ্রাম এবং সন্ধ্যার পর তুলনামূলক ভারী খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।
এ ধরনের অভ্যাস শরীরের ওপর তাপজনিত চাপ কমাতে এবং শক্তি ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়ছে। ফলে গরমকালীন খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত পানির গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং বাইরে কাজ করা শ্রমজীবীদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই এ সময় নিয়মিত পানি পান, হালকা খাবার গ্রহণ এবং অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
তাপপ্রবাহের সময় সুস্থ থাকার জন্য অতিরিক্ত বা ভারী খাবারের পরিবর্তে হালকা, পুষ্টিকর ও পানি-সমৃদ্ধ খাদ্য বেছে নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন শরীরকে গরমের বিরূপ প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
