ইসরায়েলের আসন্ন নেসেট নির্বাচনকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন নির্বাচন হিসেবে দেখছেন লেখক মো. এহতেশামুল হক। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেতানিয়াহুর সামনে এবার সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটসহ একাধিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত কলামে লেখক ইসরায়েলের বর্তমান রাজনীতি, গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরের সহিংসতা এবং দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—দুই হাজার বছর ধরে নিপীড়নের ইতিহাস বহন করা একটি জাতি কি শেষ পর্যন্ত সেই রোমানদের মতো হয়ে উঠছে, যারা একসময় জেরুজালেমের দ্বিতীয় উপাসনালয় ধ্বংস করেছিল?
কলামে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট ১২০টি আসন রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ আসনের সমর্থন। কোনো একক দলের পক্ষে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হওয়ায় জোট গঠন ইসরায়েলি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী ২৭ অক্টোবর নেসেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। লেখকের বর্ণনায়, গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে নেতানিয়াহু দেশটির রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ফিরে আসার কারণে তাঁকে ইসরায়েলি রাজনীতির ‘সারভাইভার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় নেতানিয়াহুর অবস্থানও কলামে তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে বলেছেন, তাঁর নেতৃত্বে কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া হবে না।
নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কলামে গাদি আইজেনকোটের নাম এসেছে। তিনি ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর তিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।
যুদ্ধে আইজেনকোটের ২৫ বছর বয়সী ছেলে গাল আইজেনকোট নিহত হন। একই যুদ্ধে তাঁর দুই ভাগনেও মারা যান। ২০২৪ সালের জুনে যুদ্ধ পরিচালনায় সরকারের অযোগ্যতার অভিযোগ তুলে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
কলামে বলা হয়েছে, তাঁর নবগঠিত দল ‘ইয়াশার’ বিভিন্ন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে এবং কখনো কখনো এগিয়েও আছে। যুদ্ধে সন্তান হারানো সাবেক এই সেনাপ্রধানের প্রতি ইসরায়েলি সমাজের একটি অংশের সহানুভূতিও তাঁর রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনে আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের কথা বলা হয়েছে। কলামে তাঁর অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে।
লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, বেন গভির অতীতে উগ্রপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আদালতে বর্ণবাদে উসকানি ও একটি নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।
১৯৯৪ সালে হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদে বারুখ গোল্ডস্টেইনের গুলিতে ২৯ ফিলিস্তিনি নিহত ও ১২৫ জন আহত হওয়ার ঘটনাও কলামে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের দাবি, বেন গভির দীর্ঘদিন তাঁর বসার ঘরে গোল্ডস্টেইনের ছবি রেখেছিলেন এবং ২০২০ সালে রাজনৈতিক জোট গঠনের স্বার্থে সেটি সরিয়ে ফেলেন।
কলামে আরও দাবি করা হয়েছে, ১৫ আগস্ট প্রচারিত এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে বেন গভির গাজায় নিয়মিত হামলা চালানোর পক্ষে মন্তব্য করেন এবং এমন মানুষদের নিয়েও বক্তব্য দেন, যাঁদের তিনি বেঁচে থাকার যোগ্য মনে করেন না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং গাজায় সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় কলামের বড় অংশজুড়ে এসেছে।
লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটে।
কলামে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাধীন গবেষণা ও অন্যান্য সূত্রে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে জাতিসংঘ-সমর্থিত আইপিসি গাজা সিটি ও আশপাশের এলাকায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছিল বলেও লেখায় উল্লেখ রয়েছে।
গাজায় সংঘাতের প্রভাব বোঝাতে লেখক হিন্দ রজব ও ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরেছেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজা সিটিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গাড়িতে থাকা শিশু হিন্দ রজব হামলার পর জীবিত ছিলেন এবং উদ্ধারের জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন। পরে তাঁকে উদ্ধারে যাওয়া দুই প্যারামেডিকসহ তাঁর মরদেহ পাওয়া যায় বলে কলামে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাত ত্রাণকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের দাবি, ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হিন্দ রজবের মৃত্যুসহ সেনাদের আচরণ নিয়ে ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণা দিলেও ওই সাত ত্রাণকর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় একই ধরনের তদন্ত না করার কথা জানিয়েছে।
কলামে গাজার পাশাপাশি পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে।
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নিয়ে হাকাবি সম্প্রতি কঠোর মন্তব্য করেছেন। একটি ফিলিস্তিনি-মার্কিন পরিবারের বাড়ি ঘেরাও করে পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাকে তিনি ‘ভয়ংকর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বলে কলামে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখক মনে করেন, পশ্চিম তীরে চলমান সহিংসতার পেছনে ফিলিস্তিনিদের নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করার কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
কলামের শেষাংশে লেখক ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হিসেবে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন—দুটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে পাশাপাশি অবস্থান করাই এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির পথ হতে পারে।
নেসেট নির্বাচনের ফল কী হবে, তা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না উল্লেখ করে লেখক বলেন, নেতানিয়াহু অতীতে বহুবার রাজনৈতিক সংকট থেকে ফিরে এসেছেন। তবে তাঁর মতে, এবারের নির্বাচন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে।
কলামের শেষদিকে লেখক ইসরায়েলি ভোটারদের উদ্দেশে মূল প্রশ্নটি তুলে ধরেছেন—দুই হাজার বছর ধরে টিকে থাকা একটি জাতি কি শেষ পর্যন্ত সেই রোমানদের পথ অনুসরণ করবে, নাকি নিজেদের ইতিহাস ও পরিচয়ের অন্য কোনো অর্থ খুঁজে নেবে?
লেখক: মো. এহতেশামুল হক, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আইনজীবী ও লেখক।
