আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তে সাংবিধানিক বিতর্কে নতুন অধ্যায়, সংসদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল
দেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে ঘিরে দীর্ঘদিনের আইনি বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা পৃথক তিনটি আপিল খারিজ করে দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল, গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা এবং সংবিধানের কয়েকটি বিতর্কিত ধারা বাতিলসংক্রান্ত হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল থাকল।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এ সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব আপিল খারিজ করা হয়েছে। ফলে হাইকোর্ট যে বিষয়গুলোকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, সেগুলো বহাল থাকবে।
এর মধ্যে রয়েছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়, গণভোটের বিধান পুনর্বহাল এবং সংবিধানে সংযোজিত ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বাতিলের সিদ্ধান্ত।
আইনজীবীদের মতে, আপিল বিভাগের এই রায়ের ফলে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণগুলো কার্যকর অবস্থায় রয়ে গেল এবং ভবিষ্যতে সাংবিধানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হলো।
পঞ্চদশ সংশোধনী সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক আপিল করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি করেছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চারজন বিশিষ্ট নাগরিক। অপর দুটি আপিল করেছিলেন নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
গত কয়েক দিন ধরে এসব আপিলের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করেন। নির্ধারিত দিনে সব আপিল খারিজ করে চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়।
২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫০টিরও বেশি স্থানে পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ। একই সঙ্গে গণভোটের বিধান বাতিল এবং সংবিধানে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়, যেখানে সংবিধানের নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে দায়ের করা পৃথক রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ওই সংশোধনীর কয়েকটি ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট বাতিলসংক্রান্ত ধারাগুলোকে বাতিল ঘোষণা করেন এবং সংবিধানের ৭(ক), ৭(খ) ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদও সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত দেন।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ফলে হাইকোর্টের অসাংবিধানিক ঘোষণাগুলো বহাল থাকল।
তার মতে, এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সাংবিধানিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে। একই সঙ্গে গণভোটের বিধানও কার্যত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের নীতিগত ও রাষ্ট্রীয় দর্শনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব জাতীয় সংসদের ওপরই ন্যস্ত থাকবে। ফলে ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক সংস্কারে সংসদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আপিল বিভাগের এ রায় বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা, সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক ও আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এছাড়া গণভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়টি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসতে পারে।
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ে আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায় দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, গণভোট এবং সংবিধানের কিছু বিতর্কিত ধারা নিয়ে আদালতের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সংস্কার প্রক্রিয়ায় জাতীয় সংসদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন রাজনৈতিক দল, আইন বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে।
