বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বাড়ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ দেশের নাগরিকরা বর্তমানে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করছেন।
পিউ রিসার্চ সেন্টার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষের মতামত সংগ্রহ করে এই গবেষণা পরিচালনা করে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাওয়া হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, জরিপে অন্তর্ভুক্ত ৩৬ দেশের মধ্যে ২৫টিতে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে স্পেন, ইতালি, গ্রিস, কানাডা এবং ইন্দোনেশিয়ায় চীনের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান ও ইসরাইল—এই ছয়টি দেশে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে।
পিউ রিসার্চের গবেষক জোনাথন শুলম্যান বলেন, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তা কমলেও সাধারণত চীনের অবস্থান কাছাকাছি থাকত। তবে এবার প্রথমবারের মতো অনেক দেশে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে চীন এগিয়ে গেছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ইতালি, স্পেন, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গবেষকদের মতে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চীনের প্রতি সমর্থন তুলনামূলক বেশি হলেও উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে চীনের প্রতি সংশয় বা নেতিবাচক মনোভাব বেশি দেখা যায়। তবে সিঙ্গাপুর এই প্রবণতার ব্যতিক্রম।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জনমতের পার্থক্যও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। পাকিস্তানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন, যেখানে জাপানে এ হার মাত্র ১১ শতাংশ।
বিশ্বনেতাদের প্রতি আস্থার প্রশ্নেও জরিপ পরিচালনা করা হয়। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি মানুষের আস্থা মূল্যায়ন করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, উভয় নেতার প্রতি আস্থার মাত্রা সীমিত হলেও অধিকাংশ দেশে শি জিনপিং ট্রাম্পের তুলনায় বেশি সমর্থন পেয়েছেন।
শি জিনপিংয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের উত্তরদাতারা, যেখানে এ হার ৮৩ শতাংশ। বিপরীতে জাপানে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ তার প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রতি সর্বোচ্চ ৬৮ শতাংশ আস্থা দেখা গেছে ফিলিপাইনে, আর সর্বনিম্ন ৪ শতাংশ আস্থা পাওয়া গেছে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে।
জরিপে আরও উঠে এসেছে যে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে এখনো অনেকেই চীনের তুলনায় এগিয়ে মনে করেন। তবে এই ব্যবধান আগের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ৭৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে। চীনের ক্ষেত্রে একই মত পোষণ করেছেন ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক সম্পৃক্ততা এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক দেশ বিকল্প বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে চীনের দিকে ইতিবাচকভাবে ঝুঁকছে।
তবে চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি, সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ এখনো বিদ্যমান। ফলে দেশটির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বাড়লেও নেতৃত্বের প্রতি আস্থা তুলনামূলকভাবে সীমিত রয়েছে।
সূত্র: পিউ রিসার্চ সেন্টার ও বিবিসি
