ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে দিকভ্রান্ত হয়ে মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছানো নৌকা থেকে ২৯ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৭ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে এবং ২৪ জনই সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। উদ্ধার হওয়া ২৭ জন বর্তমানে সুস্থ আছেন এবং মিশরের স্থানীয় পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। অপর দুই বাংলাদেশি এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সুনামগঞ্জের আব্দুল করিম নামে এক জীবিত উদ্ধার হওয়া যাত্রী জানিয়েছেন, নৌকায় থাকা আরও নয় বাংলাদেশি সাগরে মারা গেলে তাঁদের মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, মানবপাচারকারীদের সহায়তায় গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তবুক এলাকা থেকে নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার পর নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এতে নৌকাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় ১০ দিন সাগরে ভাসতে থাকে। পরে ১৩ আগস্ট মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছালে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় বাংলাদেশিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।
মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন জানান, উদ্ধার হওয়া ২৭ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়েছেন। বর্তমানে তাঁরা মারসা মাতরুহ পুলিশ স্টেশনের সঙ্গে থাকা একটি অস্থায়ী কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের ছবি ও ঠিকানা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
পুলিশের হেফাজতে থাকা ২৭ বাংলাদেশির মধ্যে ২৪ জন সিলেট বিভাগের চার জেলার বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে সুনামগঞ্জ সদরের ১২ জন হলেন—তায়েবুর রহমান, মো. মাহফুজ মিয়া, মো. লোহানী আহমেদ, বদর উদ্দিন, সোহেল মিয়া, মো. হোসাইন আহমেদ, আলিম উদ্দিন, সাব্বির হোসেন তালহা, এনাম উদ্দিন, আবু সাঈদ এয়াহিয়া, আব্দুল করিম ও মো. মামুন খান।
এ ছাড়া সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার নাইম আহমেদ, জগন্নাথপুরের সাইদুল ইসলাম, মো. হোসাইন মিয়া, আরিফ আহমেদ ও হুজাইফা বিন হোসাইন এবং ছাতকের তোফায়েল আহমেদ রয়েছেন।
হবিগঞ্জ সদরের মোস্তাকিন ভূঁইয়া এবং আজমিরীগঞ্জের সোহেল মিয়া ও রিয়াজ উদ্দিন আহমদও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন। সিলেট জেলার গোয়াইনঘাটের তানভীর হোসেন এবং বিয়ানীবাজারের রাজু মিয়া ও নজরুল ইসলামও তাঁদের সঙ্গে আছেন।
সিলেট বিভাগের বাইরে থাকা তিনজন হলেন মাদারীপুরের মো. ফারুক, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের সায়মন মিয়া এবং ভৈরবের মহরম আলী। হাসপাতালে থাকা অপর দুই বাংলাদেশির পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
দূতাবাসের কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানান, এ ঘটনায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের মেহেদি হাসান, তাঁর বাবা মো. সাবু মিয়া, মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে ১৬ আগস্ট বিকেলে একই উপকূল থেকে আরও এক বাংলাদেশির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুটি মরদেহ বর্তমানে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
মরদেহ দুটির পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাগরে নিখোঁজ নয় বাংলাদেশির পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করতে জীবিত উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সাক্ষাৎকার নেওয়ার অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
এদিকে নৌকা থেকে শামীম আহমেদ ও হাবিব উল্লাহর নামে দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং হৃদয় পাল, মো. হাবিব উল্লাহ ও নুর আলমের নামে তিনটি পাসপোর্ট পাওয়া গেছে।
জাকির হোসেন বলেন, মিশরের আইন অনুযায়ী আদালত ও প্রসিকিউশনের সিদ্ধান্তের পর আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। একই সঙ্গে মর্গে থাকা দুই মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে আটক বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং মৃতদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
