সৌদি আরবের রিয়াদে কর্মস্থলে আগুনে নিহত নাটোরের নলডাঙ্গার শামীম হোসেন তাঁর এক মাসের মেয়েকে আর কোলে নিতে পারলেন না। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে রোববার সকাল ১০টার দিকে মুঠোফোনে ভিডিও কলে মেয়ের মুখ শেষবারের মতো দেখেছিলেন তিনি। এরপরই আসে তাঁর মৃত্যুর খবর।
শামীমের স্ত্রী মিতু খাতুনের কোলে এখন এক মাস চার দিনের শিশু ছাপা জান্নাহ। বাবাকে আর কখনো সামনাসামনি দেখবে না—এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে পরিবারটির।
শামীম হোসেন নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামের জাকির হোসেনের একমাত্র ছেলে। গত রোববার সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে শামীমসহ ১৬ জন বাংলাদেশি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একই এলাকার আরও দুই বাসিন্দা—সাব্বির আহমেদ (৩০) ও রবিউল আউয়াল (২৫)—রয়েছেন।
শামীমের পরিবার জানায়, প্রায় আট মাস আগে তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমান। এর আগে ২০১৬ সালে কৃষক পরিবারের এই তরুণ পাঁচ লাখ টাকা ধার করে প্রথমবার সৌদি আরবে যান। পাঁচ বছর পর, ২০২১ সালে দেশে ফিরে ঘরবাড়ি পাকা করেন এবং বিয়ে করেন মিতু খাতুনকে। দেশে প্রায় পাঁচ বছর থাকার পর আবার বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তখন তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
মেয়ের জন্মের পর সৌদি আরব থেকেই তাঁর নাম রাখেন ছাপা জান্নাহ। মেয়ের আকিকার জন্যও তিনি টাকা পাঠিয়েছিলেন। প্রতিদিন অন্তত দুবার ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন শামীম।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিতু খাতুন বলেন, ‘আমাকে বলত, আগামী রোজার ঈদে এসে মেয়েকে সোনার চুড়ি হাতে দিয়ে কোলে নিবেন। তাঁর সেই আশা আর পূরণ হলো না।’
স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট মেয়েকে কীভাবে বড় করবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মিতু।
নলডাঙ্গার দিঘীরপাড় গ্রাম থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পশ্চিমে শ্রীপুর গ্রামে বাড়ি নিহত সাব্বির আহমেদের। সেখানেও চলছে শোকের মাতম।
সাব্বিরের বাবা গোলাম রাব্বানী জানান, প্রায় সাড়ে চার বছর আগে তাঁর ছেলে সৌদি আরবে যান। আগামী ঈদে তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল। প্রায় আড়াই বছর আগে ছেলের বিয়ে দেন তিনি। তবে এত দিন পুত্রবধূকে বাড়িতে আনা হয়নি।
স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই প্রথমবারের মতো শ্বশুরবাড়িতে আসেন সাব্বিরের স্ত্রী। ফলে স্বামীকে নিয়ে সংসার শুরুর আগেই তাঁকে বিধবার জীবন বেছে নিতে হলো।
গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আজই প্রথমবারের মতো বউমা বাড়িতে এসেছে। কিন্তু সে তো আর স্বামীকে দেখতে পেলো না। এই কষ্ট কীভাবে সইব?’
শ্রীপুর থেকে আরও প্রায় চার কিলোমিটার পশ্চিমে মহিষডাঙ্গা গ্রাম। সেখানকার বাসিন্দা আসলাম হোসেনের ছেলে রবিউল আউয়ালও রিয়াদের ওই অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন।
রবিউলের বয়স হয়েছিল ২৫ বছর। তিনি অবিবাহিত ছিলেন এবং প্রায় দুই বছর আগে সৌদি আরবে যান। আগামী ঈদে দেশে ফেরার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।
রবিউল ও তাঁর ভাই একই সোফা কারখানায় কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রবিউল মারা গেলেও তাঁর ভাই প্রাণে বেঁচে গেছেন। তবে আকামা না থাকায় নিহত ব্যক্তিদের সরকারি তালিকায় রবিউলের নাম ওঠেনি বলে পরিবার জানিয়েছে।
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান খান গতকাল সোমবার দুপুরে নিহত তিনজনের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাঁদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন।
ইউএনও জানান, সরকার সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে নিহত বাংলাদেশিদের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মরদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রিয়াদের সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নাটোরের একই এলাকার তিনজনের মৃত্যুতে তাঁদের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রবাসে স্বজন হারানো পরিবারগুলো এখন অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফেরার।
