ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ জানিয়েছেন, ২০২৯ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ ট্রিলিয়ন বা পাঁচ লাখ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে। তবে নরেন্দ্র মোদি সরকারের আগের একই ধরনের প্রতিশ্রুতি নির্ধারিত সময়ে পূরণ না হওয়ায় নতুন এই লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ২০১৮ সালে প্রথমবার ২০২৫ সালের মধ্যে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ঘোষণা দেওয়া হলেও ২০২৫ সাল পেরিয়ে ভারত এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
গত সপ্তাহে সংসদে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ ২০২৯ সালের লক্ষ্যের কথা জানান। সাধারণ চক্রবৃদ্ধি হারে প্রবৃদ্ধির হিসাবের ওপর ভিত্তি করে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভারতের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যটি ভারতের রাজনীতিতে নতুন নয়। মোদি সরকারের আমলে কয়েক দফায় এই সময়সীমা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিবার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও লক্ষ্য অর্জিত হয়নি এবং এর কারণ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি।
২০১৮ সালের শুরুতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ওই বছরই সরকার জানায়, লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি পথনকশা তৈরি করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
পরের বছর মোদি সময়সীমা আরও এগিয়ে ২০২৪ সাল করেন। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের মধ্যেই ভারতের অর্থনীতি ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। তবে এই সময়সীমা পরিবর্তনের পেছনে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে কী পরিবর্তন হয়েছিল, তা প্রকাশ করা হয়নি।
এরপর ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতের অর্থনীতি বড় ধাক্কার মুখে পড়ে। করোনাভাইরাসের সময় কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর লকডাউনের প্রভাবে ওই অর্থবছরে দেশটির অর্থনীতি ৭ শতাংশের বেশি সংকুচিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাকালে ভারতের মতো বড় কোনো দেশের অর্থনীতি এতটা সংকুচিত হয়নি।
তারপরও ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি বিজেপি সরকার। ২০২২ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যেই ভারত ওই লক্ষ্যে পৌঁছাবে। কয়েক মাস পর সাইপ্রাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও একই লক্ষ্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
কিন্তু ২০২৫ সাল শেষ হলেও ভারত ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারেনি।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য পূরণ না হলেও সরকার পরে আবারও একই লক্ষ্যের কথা তোলে। ২০২৫ সালে মোদি ফের ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কথা বলেন, তবে এবার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি। তিনি বলেছিলেন, ভারত ওই পর্যায়ে পৌঁছানোর দিন খুব বেশি দূরে নয়।
এরপর ধীরে ধীরে আলোচনার কেন্দ্রে আসে আরও দীর্ঘমেয়াদি একটি লক্ষ্য। বিজেপি সরকার ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের অর্থনীতির আকার ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার কথা ঘোষণা করে। একই সময়ের মধ্যে ভারতকে ‘পুরোপুরি উন্নত অর্থনীতি’তে পরিণত করার লক্ষ্যও সামনে রাখা হয়।
দূরবর্তী এই লক্ষ্য নির্ধারণের ফলে আগের ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির মতো তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয় না বলে প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোদি সরকারের অর্থনৈতিক রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হলো বড় লক্ষ্য ও উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি সামনে আনা। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ঐক্যবদ্ধ প্রগতিশীল জোটের (ইউপিএ) সরকারের শেষ দিকে মোদি ভারতকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। ‘আচ্ছে দিন’ বা ভালো দিন আসার প্রতিশ্রুতি ছিল সেই রাজনৈতিক বার্তার অন্যতম কেন্দ্রীয় অংশ।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরকারের উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন ও জনচাপ না থাকায় এসব প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে টিকে গেছে। অনুগত সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার কারণেও সরকারের অতিরিক্ত আশাবাদী পূর্বাভাস নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি বলে লেখায় দাবি করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, সংসদে মোদি সরকার জানিয়েছে, ভারত এখনো ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারেনি। একই সময়ে ভারতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থান চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ স্থানে নেমে এসেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকার ও এর সমর্থকেরা ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারার জন্য রুপি-ডলারের বিনিময় হারকে দায়ী করার চেষ্টা করেছে। তবে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রুপির দুর্বলতা নিজেই ভারতীয় অর্থনীতির দুর্বলতার একটি ইঙ্গিত। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারত থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ফলে রুপির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোদি সরকারের তৃতীয় মেয়াদে তাঁর সমর্থক শহুরে মধ্যবিত্তের একটি অংশের মধ্যে অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। প্রথমে অনলাইন আলোচনায় এবং পরে কথিত ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের রাজপথের কর্মসূচিতে এই ক্ষোভের প্রকাশ দেখা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (জিএআই) প্রসার ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অনেক প্রচলিত কাজ এখন জেনারেটিভ এআই দিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ কাজ করেন এবং দেশটির জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৭ শতাংশ। ফলে এ খাতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাব ভারতের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন খাত সম্প্রসারণে মোদি সরকারের উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বরং মোদি সরকারের সময়ে জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অংশ কমেছে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের মাথাপিছু জিডিপিও তুলনামূলকভাবে কম। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দেশটির মাথাপিছু জিডিপি ছোট প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের চেয়েও নিচে।
এদিকে ঝাড়খন্ডে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক বিক্ষোভের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের অর্থনীতির এসব সমস্যা কীভাবে সমাধান করা হবে, সে বিষয়ে বিরোধীদের কাছেও সুস্পষ্ট সমাধান নেই বলে লেখাটিতে মন্তব্য করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য নির্ধারণ ও বাস্তব অর্জনের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ব্যবধান মোদি সরকার ও তার সমর্থকদের জন্য যেমন উদ্বেগের বিষয়, তেমনি ভারতের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও তা নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
