যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সাইক্লোস্পোরা নামের পরজীবীজনিত সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, চলতি বছরের মে মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬৪৫টি স্থানীয় সংক্রমণের ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও ৫ হাজার ১০০-এর বেশি রিপোর্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যেগুলোও চলমান প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, আগস্ট পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। যদিও এই রোগ সাধারণত প্রাণঘাতী নয়, তবে এটি দীর্ঘস্থায়ী পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কী এই সাইক্লোস্পোরা?
সাইক্লোস্পোরা একটি অণুবীক্ষণিক পরজীবী, যা মানুষের অন্ত্রে সংক্রমণ ঘটিয়ে ‘সাইক্লোস্পোরিয়াসিস’ নামের রোগ সৃষ্টি করে। চিকিৎসা না করলে আক্রান্ত ব্যক্তি কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত নানা উপসর্গে ভুগতে পারেন।
অন্যান্য অনেক খাদ্যবাহিত রোগের মতো এটি সাধারণত সরাসরি একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায় না। মানবদেহ থেকে নির্গত হওয়ার পর পরিবেশে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ অবস্থান করার পরই পরজীবীটি সংক্রমণ ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সালমোনেলা বা ই. কোলাইয়ের তুলনায় সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণ কম দেখা গেলেও গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রাদুর্ভাবের সংখ্যা বেড়েছে। উন্নত পরীক্ষাব্যবস্থা এবং উষ্ণ আবহাওয়া এ প্রবণতার অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কীভাবে ছড়ায় সংক্রমণ?
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে মানুষ এ পরজীবীতে আক্রান্ত হয়। সাধারণত মানববর্জ্য খাদ্য বা পানির উৎসে মিশে গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
অতীতে বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবে কাঁচা শাকসবজি, পাতাজাতীয় সবজি, বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ ও বেরিজাতীয় ফলকে দায়ী করা হয়েছে। কারণ এসব খাদ্য সাধারণত রান্না ছাড়া খাওয়া হয় এবং দূষিত সেচ বা ধোয়ার পানির সংস্পর্শে আসতে পারে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের উৎস এখনো শনাক্ত করা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) বিভিন্ন ধরনের তাজা কৃষিপণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে অনুসরণ করে দূষণের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
মিশিগান অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা লেটুসকে সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করলেও এখনো কোনো নির্দিষ্ট পণ্য, উৎপাদক বা সরবরাহকারীকে দায়ী করা হয়নি।
কোন খাবারের সঙ্গে বেশি সম্পর্ক পাওয়া গেছে?
পূর্ববর্তী প্রাদুর্ভাবগুলোতে লেটুস, প্যাকেটজাত সালাদ, ধনেপাতা, তুলসী পাতা, রাস্পবেরি, স্ন্যাপ পি, কোলস্লো, সবজি ট্রে এবং তাজা ফলের মিশ্রণের সঙ্গে সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কিছু শাখায় টাকো বেল তাদের মেনু থেকে লেটুস, ধনেপাতা, পিকো দে গায়ো এবং গুয়াকামোল সাময়িকভাবে সরিয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে।
উপসর্গ কী?
সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণের লক্ষণ সাধারণত দূষিত খাবার বা পানি গ্রহণের প্রায় এক সপ্তাহ পর দেখা দেয়। তবে সংক্রমণের দুই দিন পর থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেও উপসর্গ শুরু হতে পারে।
সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ হলো ঘন ঘন পানিযুক্ত ডায়রিয়া। এছাড়া ক্ষুধামন্দা, ওজন কমে যাওয়া, পেটে ব্যথা, গ্যাস, পেট ফাঁপা, বমিভাব এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে বমি, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, হালকা জ্বর ও ফ্লুর মতো উপসর্গও দেখা যায়। আবার অনেক আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে।
প্রতিরোধে করণীয়
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ঝুঁকি কমাতে খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক কিছু নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- ফল ও সবজি প্রস্তুতের আগে এবং পরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া।
- “প্রি-ওয়াশড” লেখা থাকলেও সব ধরনের তাজা ফল ও সবজি প্রবাহমান পানিতে ধুয়ে খাওয়া।
- শক্ত ফল ও সবজি পরিষ্কারে পরিষ্কার ব্রাশ ব্যবহার করা।
- কাটা, খোসা ছাড়ানো বা রান্না করা ফল ও সবজি দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা।
কোন অঙ্গরাজ্যে বেশি আক্রান্ত?
সিডিসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টিরও বেশি অঙ্গরাজ্যে সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে মিশিগান, যেখানে ৫০১ থেকে ৯০০টি সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়া নিউইয়র্কে ১৬১ থেকে ৩০০, নর্থ ক্যারোলাইনায় ৮১ থেকে ১৬০ এবং ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, কেনটাকি, নিউ জার্সি ও টেক্সাসে ৩১ থেকে ৮০টি করে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া আলাস্কা, ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, ওহাইও, পেনসিলভানিয়াসহ আরও বহু অঙ্গরাজ্যে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে, যদিও বেশিরভাগ স্থানে আক্রান্তের সংখ্যা ৩০-এর নিচে।
বর্তমান পরিস্থিতি
বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব মিশিগান এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এখনো এটিকে জাতীয় জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করছেন না।
সিডিসির ভারপ্রাপ্ত পরজীবী রোগ শাখার প্রধান ডায়ানা ব্লাউ বলেন, পরজীবীটির সংক্রমণক্ষমতা বেড়েছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রতি বছরই যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার মানুষ সাইক্লোস্পোরায় আক্রান্ত হন। তবে চলতি বছরের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
সাইক্লোস্পোরা শনাক্ত করতে মলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একবারের পরীক্ষায় পরজীবী ধরা না পড়ায় রোগীকে কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক নমুনা দিতে বলা হয়।
অণুবীক্ষণিক পরীক্ষা ছাড়াও পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) প্রযুক্তির মাধ্যমে পরজীবীর জিনগত উপাদান শনাক্ত করা হয়।
সিডিসির মতে, এ রোগের প্রচলিত চিকিৎসা হলো ট্রাইমেথোপ্রিম-সালফামেথক্সাজল (টিএমপি-এসএমএক্স) অ্যান্টিবায়োটিক, যা ব্যাকট্রিম ও সেপট্রা নামেও বাজারজাত করা হয়। সাধারণত সাত থেকে ১০ দিনের চিকিৎসা দেওয়া হয়, তবে দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
আক্রান্ত হলে কী করবেন?
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে হারানো তরল পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি, স্যুপ বা ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয় পান করতে হবে। একই সঙ্গে অ্যালকোহল ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এগুলো পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে।
খাবারে অনীহা থাকলেও অল্প অল্প করে নিয়মিত খাবার গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর অ্যান্টিবায়োটিক সেবন শুরু করলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী পুরো কোর্স সম্পন্ন করতে হবে।
