সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত দালালচক্রের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ব্যয় দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
বুধবার (২৯ জুলাই) ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয় দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
গবেষণাটি দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত হয়। এতে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথি, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, ৯৫ জন কর্মকর্তার মতামত এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। এর মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে এ হার সর্বনিম্ন, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দের অর্থ অব্যবহৃত থাকলেও মাত্র ১১ শতাংশ উত্তরদাতা এর জন্য আর্থিক অনিয়মকে দায়ী করেছেন। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, মূলত প্রশাসনিক জটিলতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনেক সময় এমন শর্ত যুক্ত করা হয়, যা নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে যায় এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশকে সীমিত করে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত না করেই ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। ফলে অনেক যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে রোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো, কমিশনের বিনিময়ে পরীক্ষা করানো এবং তথাকথিত ‘টেস্ট বাণিজ্যের’ অভিযোগের বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব অনিয়ম বন্ধে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
হামের টিকাদান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জানান, অতীতে নিয়মিত টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতির কারণে বর্তমানে আক্রান্ত শিশুদের ৯৯ শতাংশই টিকা পায়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে এক লাখের বেশি শিশুকে এর আওতায় আনা হয়েছে।
ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন করা হবে না। সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস মেশিন সংগ্রহ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যা এবং জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পরীক্ষামূলকভাবে ১০টি উপজেলা ও ৯০টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যকর্মীদের স্মার্টফোন, সাইকেল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা কিট সরবরাহ করা হবে বলেও জানান তিনি। এসব কর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, উচ্চতা, ওজনসহ বিভিন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, অডিটের নামে কোনো ধরনের ঘুষ গ্রহণ বা প্রদান বরদাশত করা হবে না। কেউ অনৈতিকভাবে অর্থ দাবি করলে তা সরাসরি মন্ত্রণালয়কে জানাতে আহ্বান জানান তিনি।
অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন নিয়ন্ত্রণেও কঠোর নজরদারির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিভিল সার্জন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়মিত আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজাসহ স্বাস্থ্য খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
