ওমানের সঙ্গে আলোচনায় থাকা একটি সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে অবগত ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও অঞ্চলের দুই কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এটি তেহরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই আলোচনা এগোচ্ছে। তবে সম্ভাব্য এই সমঝোতা নিয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়ে দ্রুত একটি সমঝোতা হতে পারে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত নয়।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হলে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করা জাহাজগুলোকে ইরানের জলসীমা ব্যবহার করতে হবে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালির উত্তরাংশ ইরানের এবং দক্ষিণাংশ ওমানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
যুদ্ধের আগে এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে কোনো ধরনের ফি দিতে হতো না। তবে নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরান হরমুজ ব্যবহারকারী জাহাজের বহন করা পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি আদায়ের পক্ষে। অন্যদিকে ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি প্রস্তাব করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধরনের ফি আরোপের বিরোধিতা করছে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে বলেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনায় মৌলিক সমঝোতা হয়েছে এবং তা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর দাবি, নতুন ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক জাহাজকে উপসাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় ইরানের জলসীমা ব্যবহার করতে হবে।
আলোচনায় অগ্রগতি হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বিশেষ করে উপসাগর থেকে বের হওয়া জাহাজের ওপর ইরানের ভূমিকা কী হবে, সেটি এখনো নির্ধারিত হয়নি।
একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কিছু ধরনের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা এগিয়েছে। তবে সেই নিয়ন্ত্রণের পরিধি ও বাস্তবায়নের ধরন এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান হলো, জাহাজ তল্লাশির দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর কাছেই থাকা উচিত এবং কোনো ফি আদায় করা হলে তা যেন বাধ্যতামূলক না হয়।
এদিকে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তাহলে পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানা হবে।
রয়টার্সকে পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য নতুন মার্কিন সামরিক অভিযান ঠেকাতেই তেহরান এই বার্তা দিয়েছে।
একটি উপসাগরীয় দেশের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরানের বার্তা ছিল স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হামলার মুখে পড়বে।
বর্তমানে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে তেহরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
লাস ভেগাসে এক সমাবেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি এখনো কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিতে চান।
তিনি বলেন, “আমি চুক্তি করতে চাই। কারণ, আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না। কিন্তু একটা সময় হয়তো সেটি করতেই হবে।”
ঘারিবাবাদির দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে যে জুনের মাঝামাঝি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিতে তারা ফিরে যেতে প্রস্তুত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা হয়নি বলেও তিনি জানান।
ইরানের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর দেশটিতে ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এই যুদ্ধে তাদের ১৮ জন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
এদিকে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। একই সময়ে মার্কিন সেনা কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে জানিয়েছেন, দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় পুরো মজুত ব্যবহার করে ফেলেছে।
