লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে ইয়েমেন ও জিবুতির মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব এখন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। শুক্রবার প্রণালিটির পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি বন্দরনগর মোখা দখল করেছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তাদের দাবি, নৌপথটির মাঝখানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
বাব আল-মানদেব দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনে এই পথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।তেল সরবরাহে বড় প্রভাবের আশঙ্কা
বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ বা আরও সীমিত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ কমে যেতে পারে। তখন জাহাজগুলোকে দীর্ঘ ঘুরপথে যেতে হবে। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি জাহাজভাড়া ও মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। সৌদি আরব হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নিয়ে সেখান থেকে রপ্তানি শুরু করে।
রিচার্ড ব্রোঞ্জের হিসাবে, একপর্যায়ে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল বাব আল-মানদেব হয়ে যেত। তবে হুতিদের হামলার হুমকিতে আগস্টে এই পথে সৌদি তেল পরিবহন দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।
বাব আল-মানদেব এড়িয়ে এশিয়ায় তেল নিতে জাহাজগুলোকে এখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার পর আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণে গিয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এশিয়ায় পৌঁছাতে হচ্ছে। এতে যাত্রার সময় এক মাস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাড়ছে জাহাজভাড়াও।
রিচার্ড ব্রোঞ্জ বলেন, এশিয়ার অনেক শোধনাগার বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এ কারণে অন্যান্য অঞ্চল থেকে তেল পরিবহনকারী জাহাজের জন্য বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে, যা তেলের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
বাব আল-মানদেবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হুতিদের দখলে যাওয়ার খবরের পর বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারে উঠলেও পরে তা ১০৪ ডলারে নেমে আসে। ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও বেড়েছে।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে এর প্রভাব জ্বালানি থেকে শুরু করে পরিবহন ও অন্যান্য খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অপরিশোধিত তেল থেকে উৎপাদিত ডিজেল ট্রাক, ট্রাক্টর ও মালবাহী ট্রেনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক পরিবহনে ব্যবহৃত হয়।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গতকাল দেশটিতে ডিজেলের দাম প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে এবং এতে সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়।
বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগস্টে দেশে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও তা ৮ শতাংশের ওপরে ছিল। বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদে বাব আল-মানদেব দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করেছিল হুতিরা। এরপর অনেক জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান এই নৌপথ এড়িয়ে ঘুরপথে চলাচল শুরু করে। এতে পণ্য পরিবহনে সময় বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি, বিমা ও নাবিকদের মজুরির খরচও বেড়ে যায়।
জেনেটার প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ডের হিসাবে, এরপর থেকে বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে। গত দুই দিনে সংঘাত বাড়ার পর এই পথে জাহাজ চলাচল আরও ৪৬ শতাংশ কমেছে। তবে পুরোপুরি জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন না।
তবে ঝুঁকি যে রয়ে গেছে, তা উল্লেখ করে পিটার স্যান্ড বলেন, বাব আল-মানদেব দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজই সম্ভাব্য লক্ষ্য।
