দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশে ছয়টি সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয়টি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, মার্কিন হামলায় হতাহতের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এই পাল্টা অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে যুদ্ধ অবসানের উদ্দেশ্যে ৬০ দিনের আলোচনা প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৩৮ জন নিহত এবং চার শতাধিক আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরান। দেশটির ভাষ্যমতে, সর্বশেষ রাতের হামলাতেই অন্তত আটজন প্রাণ হারিয়েছেন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৪০ মিনিটে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সর্বশেষ বড় ধরনের সামরিক অভিযান সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে কোন কোন স্থাপনায় হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে, ইরানের ফারস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ছয়টি সেতু, একটি রেলস্টেশন এবং আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে অন্তত আটজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
হরমোজগান প্রদেশে আক্রান্ত সেতুগুলোর মধ্যে রয়েছে বন্দর আব্বাসকে খমীর ও লারের সঙ্গে সংযুক্ত গারিভেহ সেতু, লাতিদান গ্রামের নিকটবর্তী একটি সেতু, কাহুরেস্তান-লার সড়কের দুটি সেতু, বন্দর-ই-খমীর, কেশার ও বন্দর আব্বাসকে সংযুক্ত একটি নির্মাণাধীন সেতু এবং খমীর জেলার মারু গ্রামের একটি সেতু।
ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলার কারণে বন্দর আব্বাস ও আশপাশের এলাকার বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় ক্ষতি হয়েছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে, যদিও কিছু এলাকায় পুনরায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর কাজ শুরু হয়েছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের মধ্যে এটি তাদের ১৩তম পাল্টা হামলা। শুক্রবার সকালে বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানায়।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভোরে দেশটির আকাশসীমার দিকে ছোড়া অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্রসহ একাধিক প্রজেক্টাইল প্রতিহত করা হয়েছে। তবে দোহার আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের সময় ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক শিশু আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, ওমানের ঘানিম এলাকায় একটি মার্কিন এয়ার কন্ট্রোল রাডার এবং হরমুজ প্রণালির জলসীমায় একটি মেরিটাইম কন্ট্রোল রাডার ধ্বংস করা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের খাসাব উপকূল থেকে প্রায় ১৯ নটিক্যাল মাইল পূর্বে একটি তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির দাবি, কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার, কয়েকটি অস্ত্রাগার এবং দুটি হাইমার্স সারফেস-টু-সারফেস ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে নিক্ষিপ্ত তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, সিরিয়ার আল-তানফ এলাকায় অবস্থিত মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড সেন্টারও আইআরজিসির হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ইরানের দাবি, ইরানশাহরে তাদের সেনা সদস্যদের হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
