পরিবেশবান্ধব ও কার্বনমুক্ত গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে আরেক ধাপ এগিয়েছে ভারত। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলচালিত ট্রেনের উদ্বোধন করেছেন। এর মাধ্যমে জার্মানি, জাপান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর হাইড্রোজেনভিত্তিক রেল প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হলো ভারত।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর রেলওয়ের ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ জিন্দ-সোনিপৎ রুটে চলাচলের জন্য প্রস্তুত করা ১০ কোচের এই ট্রেনটি বর্তমানে বিশ্বের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, প্রচলিত ডিজেলচালিত ট্রেনের বিপরীতে এই ট্রেনটি কোনো ওভারহেড বৈদ্যুতিক লাইনের ওপর নির্ভরশীল নয়। এতে ব্যবহৃত ১ হাজার ২০০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রোটন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন (পিইএম) ফুয়েল সেল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
ট্রেনটির দুটি পাওয়ার কারে উচ্চচাপের সিলিন্ডারে সংকুচিত হাইড্রোজেন সংরক্ষণ করা হয়। ফুয়েল সেলে প্রবেশের পর প্লাটিনাম অনুঘটকের সহায়তায় হাইড্রোজেনের প্রোটন ও ইলেকট্রন পৃথক হয়ে যায়। ইলেকট্রন বাহ্যিক বৈদ্যুতিক সার্কিটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, যা ট্রেনের ট্র্যাকশন মোটর সচল রাখে। একই সময়ে বাতাস থেকে নেওয়া অক্সিজেন প্রোটন ও ইলেকট্রনের সঙ্গে বিক্রিয়ায় অংশ নেয়।
এই প্রক্রিয়ায় কোনো জ্বালানি দহন বা ধোঁয়া সৃষ্টি হয় না। ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিবর্তে কেবল জলীয় বাষ্প ও তাপ উৎপন্ন হয়, যা প্রযুক্তিটিকে অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব করে তুলেছে।
ফুয়েল সেল থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিতে জমা থাকে। ট্রেনের গতি বৃদ্ধির সময় এই শক্তি ব্যবহার করা হয় এবং ব্রেক করার সময় উৎপন্ন শক্তিও পুনরুদ্ধার করে ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তি ঘনত্বের দিক থেকে হাইড্রোজেন ডিজেলের তুলনায় অনেক এগিয়ে। প্রতি কেজি ডিজেলে যেখানে প্রায় ৪৩ মেগাজুল শক্তি পাওয়া যায়, সেখানে হাইড্রোজেনে পাওয়া যায় প্রায় ১২০ মেগাজুল শক্তি। ফলে কার্বন নির্গমন ছাড়াই উচ্চ কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
ট্রেন পরিচালনার জন্য হরিয়ানার জিন্দে স্থাপন করা হয়েছে ভারতের বৃহত্তম রেলওয়ে হাইড্রোজেন সংরক্ষণ ও রিফুয়েলিং কেন্দ্র। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত এই স্থাপনায় প্রায় ৩ হাজার কেজি হাইড্রোজেন সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে এবং এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছে।
রিসার্চ, ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশনের (আরডিএসও) কারিগরি তত্ত্বাবধানে তৈরি ১০ কোচের ট্রেনটিতে একসঙ্গে প্রায় ২ হাজার ৬০০ যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন। ট্রেনটির নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হলেও নিরাপত্তার স্বার্থে প্রাথমিকভাবে এটি ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার গতিতে পরিচালনা করা হবে।
জিন্দ জংশন, গোহানা জংশন ও সোনিপতের মধ্যে চলাচলকারী এই ট্রেনে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাইড্রোজেন লিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, ফ্লেম ডিটেকশন প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় হাইড্রোজেন শাট-অফ সিস্টেম এবং চালকদের জন্য রিয়েল-টাইম স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।
ভারতের রেল খাতে এই উদ্যোগকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
