ভারতের উচ্চাভিলাষী তেজাস এমকে-২ যুদ্ধবিমান প্রকল্প নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির বিমান বাহিনীর সদ্য অবসরপ্রাপ্ত উপ-প্রধান এয়ার মার্শাল নাগেশ কাপুর। তাঁর মতে, ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বড় সংখ্যায় ভারতের বিমানবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার সময় এর যুদ্ধক্ষেত্রের কার্যকারিতা ও প্রাসঙ্গিকতা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির ২২ আগস্টের প্রতিবেদনের বরাতে নয়া দিগন্ত জানায়, অবসরের মাত্র দুই মাস পর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেন এয়ার মার্শাল কাপুর।
চীন ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং পাকিস্তান পঞ্চম প্রজন্মের বিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে—এমন পরিস্থিতিতে ২০৩৫ সালে ভারতের মতো দেশের কাছে চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান থাকা কতটা যুক্তিযুক্ত—এ প্রশ্নের জবাবে কাপুর বলেন, কার্যকারিতার দিক থেকে এটি কোনো কাজের কথা নয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-২২ এবং চীনের জে-২০-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান স্টেলথ ও সেন্সর ফিউশন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। চীন ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৫০০টি জে-২০ বিমান বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেন্সর ফিউশন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিমানের রাডার, ইনফ্রারেড ক্যামেরা ও অন্যান্য সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য কম্পিউটারের সাহায্যে একত্র করা হয়। এতে পাইলটের সামনে শত্রুর অবস্থান ও আক্রমণসংক্রান্ত একটি সমন্বিত ডিজিটাল চিত্র তৈরি হয়।
এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোনের সঙ্গে সমন্বয় সক্ষমতাসম্পন্ন ষষ্ঠ প্রজন্মের জে-৩৬ ও জে-৫০ প্রযুক্তিতেও চীন অগ্রসর হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের বিমানবাহিনীতে এখনো পঞ্চম বা ষষ্ঠ প্রজন্মের কোনো যুদ্ধবিমান নেই।
তবে এয়ার মার্শাল কাপুরের মতে, তেজাস এমকে-২ সামনের সারির যুদ্ধবিমান হিসেবে কার্যকর না হলেও ভারতের বিস্তৃত সীমান্তে প্রতিরক্ষার কিছু ঘাটতি পূরণে সীমিতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভারতের রাষ্ট্রীয় যুদ্ধবিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডের (এইচএএল) কাজের গতি নিয়েও সমালোচনা করেছেন কাপুর।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিজস্ব যুদ্ধবিমান তৈরির কোনো বিকল্প নেই। তবে একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এ জন্য ভারতকে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০১ সালে তেজাসের প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন হলেও ৪৬ হাজার কোটি রুপির চুক্তিতে ৮৩টি উন্নত তেজাস এমকে-১এ যুদ্ধবিমান কেনার আদেশ দেওয়ার পরও ভারতীয় বিমানবাহিনী এখন পর্যন্ত একটি বিমানও হাতে পায়নি। মার্কিন জেনারেল ইলেকট্রিকের ইঞ্জিন সময়মতো সরবরাহ না পাওয়া এবং এইচএএলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তেজাস এমকে-২-এর প্রোটোটাইপ তৈরির সময়সীমাও পিছিয়েছে। ২০২২ সালের লক্ষ্যমাত্রা এখন ২০২৭ সালে গিয়ে ঠেকেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের প্রথম দেশীয় স্টেলথ যুদ্ধবিমান আমকা প্রকল্পের সময়সূচি নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাবেক এই এয়ার মার্শাল। তাঁর মতে, প্রকল্পটি নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত অর্ডারের চাপের কথা উল্লেখ করে ফেব্রুয়ারিতে ভারত সরকার এইচএএলকে আমকা প্রকল্প থেকে বাদ দেয় এবং তিনটি বেসরকারি কনসোর্টিয়ামকে প্রকল্পটির দায়িত্ব দেয়।
ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ধাপে ধাপে এগোনোর সুযোগ এখন আর নেই বলে মনে করেন কাপুর। তাঁর মতে, চতুর্থ বা সাড়ে চার প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের পেছনে আরও সময় ও অর্থ ব্যয় না করে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশ করা উচিত।
এ ক্ষেত্রে ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনের যৌথ ষষ্ঠ প্রজন্মের এফসিএএস এবং যুক্তরাজ্য, ইতালি ও জাপানের জিসিএপি প্রকল্পের মতো ইউরোপীয় উদ্যোগে ভারতের অংশীদার হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
