মাঠে কৃষকের উৎপাদিত অনেক খাদ্যপণ্য ন্যায্যমূল্য না পেলেও জমি থেকে বাজারে পৌঁছানোর পর একই পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে দ্বিগুণ বা তারও বেশি। দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থায় একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়া, ব্যাপারী ও কমিশন এজেন্টের হাতবদল এবং সিন্ডিকেটের প্রভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার পেছনে অসাধু সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা রয়েছে। তাদের দৌরাত্ম্যে কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের বাজারব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে কৃষক উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে ভোক্তাদের বেশি দামে নিত্যপণ্য কিনতে হচ্ছে।
এদিকে সারের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামের কারণেও কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রবণতা এ সমস্যাকে আরও জটিল করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সিন্ডিকেটের অন্যতম কৌশল হলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করা। ডিলার ও প্রভাবশালী চক্র পণ্য বা সার গুদামজাত করে সংকট তৈরি করলে বাজারে সরবরাহ কমে যায় এবং তখন বেশি দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়।
ফলে মাঠপর্যায়ে উৎপাদিত ফসলের যথাযথ মূল্য কৃষক পান না। বিপরীতে, পণ্য একাধিক হাতবদল হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর সময় দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। আলু, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন সবজির ভরা মৌসুমেও বিশেষ চক্রের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।
একটি গবেষণাপত্রের তথ্য অনুযায়ী, কৃষক থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহ ও মূল্যশৃঙ্খলে ফড়িয়া ও ব্যাপারীসহ একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত থাকায় অনেক খাদ্যপণ্যের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। এর প্রভাব নিম্নআয়ের মানুষের ওপরও পড়ে। তাদের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ খাবারের পেছনে ব্যয় করতে হয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় কৃষক বা উৎপাদক পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কয়েকটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, কাঁচা মরিচের দাম ১১৬ শতাংশ, চালের ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজের ৮৭ শতাংশ এবং আলুর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে।
পাইজাম চালের ক্ষেত্রে কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হলেও ব্যাপারী, মিলার ও আড়তদারের হাত ঘুরে খুচরা বাজারে তা ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায় পৌঁছায়।
এ ছাড়া উৎপাদক বা খামার থেকে খুচরা পর্যায়ে মসুর ডালের দাম ৭৮ শতাংশ, বেগুনের ৭২ শতাংশ, ডিমের ২৫ শতাংশ, গরুর মাংসের ১৩ শতাংশ, মাছের ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগির দাম ২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার তথ্যও গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খুচরা পর্যায়ে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু উৎপাদন ব্যয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী, কমিশন এজেন্ট ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা বাজারে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিজেদের সুবিধামতো দাম নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছেন।
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে উচ্চ লজিস্টিক ও পরিবহন ব্যয়কেও অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে লজিস্টিক ও পরিবহন ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ফড়িয়া, ব্যাপারী ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্য একাধিকবার হাতবদল হওয়ার পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও মজুদদারির কারণে বাজারে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে।
একজন বিশ্লেষকের মতে, বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির সময় মূল্যস্ফীতি বাড়লেও পরবর্তী সময়ে অনেক দেশে তা কমেছে। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। উচ্চ লজিস্টিক ব্যয় এর অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্যপণ্যের বাজারের এই সমস্যা সমাধানে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী কমানোর পাশাপাশি কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষকদের জন্য হাট ও কার্যকর বিপণনব্যবস্থা চালু, সার ও নিত্যপণ্যের বাজারে নিয়মিত অভিযান এবং সার ও বীজ বিতরণে অনিয়ম বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদনের শুরু থেকে পণ্য ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধান করা গেলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়েও পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কমানো সম্ভব হতে পারে।
