দুর্যোগকবলিত এলাকায় নতুন বন্যার আশঙ্কা, উদ্ধারকাজে বাধা দিচ্ছে বৃষ্টি ও বিধ্বস্ত যোগাযোগব্যবস্থা
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখনো ২ হাজার ৪২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। একই সময়ে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে তিব্বতে সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৪ জন।
বুধবারের আকস্মিক বন্যার পর চতুর্থ দিনেও নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা চলছে। তবে অব্যাহত বৃষ্টি, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু এবং যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্গত এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে উদ্ধারকারী ও ত্রাণকর্মীদের ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, নিখোঁজদের সন্ধান এবং জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৮৭ জন বিদেশি নাগরিক। সম্ভাব্য নতুন বন্যার ঝুঁকির কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে হেলিকপ্টার। কিন্তু বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষে অনেক জায়গার ভূমি জলাভূমির মতো হয়ে যাওয়ায় সেখানেও হেলিকপ্টার অবতরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি। এ কাজে আরও দুটি চীনা উদ্ধারকারী দল আসার কথা রয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃষ্টির কারণে উদ্ধার তৎপরতা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কিছু এলাকায় সড়ক ও সেতু পুরোপুরি ভেসে যাওয়ায় হাজারো মানুষ দেশের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
এদিকে বন্যার পানিতে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের বাঁধ ভেঙে নতুন করে পানি নেমে আসা এবং এর ফলে ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে। নেপালের সেনাবাহিনী দুর্গত এলাকায় সম্ভাব্য নতুন বন্যার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে।
নেপালে বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান চলছে। প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার উদ্ধারকর্মী এবং প্রায় ৪০টি হেলিকপ্টার এতে যুক্ত রয়েছে। দুর্গত এলাকায় সামরিক ট্রাক ও অ্যাম্বুলেন্সও পাঠানো হচ্ছে।
নুওয়াকোটসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণবাহী গাড়ির বহর পৌঁছাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থা জরুরি ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত করেছে। এসব সামগ্রীর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, ত্রিপল ও পানি বিশুদ্ধকরণ সরঞ্জাম রয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ইতোমধ্যে ১০০টির বেশি ত্রাণ প্যাকেজ হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে সড়ক ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় দুর্গত জনগোষ্ঠীর কাছে এসব সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১৮৪ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১৪ জন ভারতের, ২৭ জন চীনের, ২০ জন দক্ষিণ কোরিয়ার এবং ৪ জন জার্মানির নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া বুলগেরিয়া, ইতালি, মাল্টা, ওমান, পর্তুগাল, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও উদ্ধার হয়েছেন।
তবে আরও ৪২০ জন বিদেশি পর্যটক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে পর্যটন বোর্ড। নিখোঁজদের মধ্যে তীর্থযাত্রী ও ট্রেকাররাও রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার ২৬ বছর বয়সী নাগরিক কারা সেভেরিনোকে নিরাপদে খুঁজে পাওয়া গেছে। তিনি লাংটাং ট্রেকে আটকা পড়েছিলেন এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে অস্ট্রেলিয়ার আরও ৪১ নাগরিকের বিষয়ে এখনো উদ্বেগ রয়েছে।
দুর্গত এলাকায় স্বজনদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ছে। সেনা ব্যারাক ও উদ্ধারকেন্দ্রের বাইরে প্রতিদিন শত শত মানুষ প্রিয়জনের খবরের অপেক্ষায় জড়ো হচ্ছেন।
অনেক পরিবার জানে না তাদের স্বজন জীবিত আছেন কি না। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, প্রবল স্রোতে মানুষ, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভেসে গেছে।
ট্রিশুলি গ্রামের ৪৩ বছর বয়সী সারাসওয়াইত ঘালে জানান, বন্যার সময় মাটি ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠছিল এবং কাদামিশ্রিত পানি দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। তিনি উঁচু জায়গায় উঠে বাঁচতে পারলেও তার বাড়িঘর ও সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে।
নেপালের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন জেলা থেকে ধারাবাহিকভাবে মরদেহ মর্গে আনা হচ্ছে। কাসকির প্রধান জেলা কর্মকর্তা কুমান সিং গুরুং জানান, তানাহুন থেকে নয়টি, নাওয়ালপরাসি ইস্ট থেকে ২৭টি এবং ধাদিং থেকে ২০টি মরদেহ পাওয়া গেছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মরদেহ সংরক্ষণের জন্য বিদেশি সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে ফ্রিজার সরবরাহের আবেদন করা হয়েছে। তিনি বলেন, মরদেহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দেশটির সক্ষমতা সীমিত।
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে জানিয়েছেন, ভয়াবহ বন্যার পর দেশ পুনর্গঠনে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এটি প্রাথমিক হিসাব এবং ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এখনো চলছে।
বন্যায় শুধু ঘরবাড়িই নয়, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এরই মধ্যে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে আবহাওয়ার অবনতি এবং নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করা হচ্ছে।
