যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক মাসের বেশি সময় সরাসরি হামলা বন্ধ থাকার পর চলতি সপ্তাহে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়িয়ে ইরানের ওপর মাঝেমধ্যে সামরিক হামলা ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার একটি কৌশল যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনা করছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে এই কৌশল এখনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদন পায়নি। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিক্ষিপ্ত হামলা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের কৌশলগত বন্দর আব্বাসের কাছাকাছি লারাক দ্বীপে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। ওয়াশিংটনের দাবি, মার্কিন বাহিনী সেখানে ইরানের দুটি রকেট নিক্ষেপকারী ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এসব লঞ্চার ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালিতে মাইন ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, ওই হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান জর্ডানে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন থাকা দুটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। জর্ডান জানিয়েছে, তারা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
এর পরই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানব।’
তবে পরে ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি ‘খুব ভালো’। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের আর্থিক ব্যবস্থা, সামরিক সক্ষমতা ও নেতৃত্ব অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও আয়োজনে ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিলেন। এতে যুদ্ধবিরতির শর্তে সম্মতি এবং ৬০ দিনের জন্য বৃহত্তর শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।
তবে সমঝোতা স্মারকের ভাষা ছিল অস্পষ্ট। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ কার থাকবে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা ছিল না।
১৭ আগস্ট চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হয়। কোনো পক্ষই মেয়াদ বাড়াতে আগ্রহ দেখায়নি। বরং উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কার্যত সমঝোতাটি ভেঙে পড়ে।
এরপরও কিছু সময় দুই দেশ সরাসরি হামলা থেকে বিরত ছিল। কিন্তু গত সোমবার থেকে আবার পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে।
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে জুনের সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করলে ইরানও চুক্তিটি কার্যকর করে হামলা বন্ধ করবে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক দফায় যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল পরিবর্তন করেছে। শুরুতে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানো হয়। এরপর যুদ্ধবিরতি এবং পরে জুনের সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করা হয়।
সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর জুলাইয়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আবার শুরু হয়। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোয় হামলা চালায়।
পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের বদলে অর্থনৈতিক চাপের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এ সময় মার্কিন বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে আসার খবর প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার কথা বলা হয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এ দাবি অস্বীকার করেছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক চাপের অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন। তাঁর ভাষ্য, এর আওতায় বিশ্বজুড়ে ইরানের আর্থিক স্বার্থ এবং বিশেষ করে দেশটির তেল খাতকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
অন্যদিকে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি বলেন, ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে—এমন দাবি সঠিক নয়। তাঁর ভাষ্য, ইরানের কাছে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে নিরাপদে বের করে আনতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে মাঝেমধ্যে হামলা চালানোর একটি কৌশল বিবেচনা করছে। তবে এই পরিকল্পনায় এখনো ট্রাম্পের অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক অস্থিতিশীল অবস্থার দিকে যাচ্ছে, যেখানে দুই পক্ষই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরতে না চাইলেও নিজেদের স্বার্থ হুমকির মুখে পড়লে সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে প্রস্তুত।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পারসির মতে, কোনো দেশের ওপর নিয়মিত বিরতিতে বোমা হামলা চালানো হলে তা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে। তাঁর ভাষ্য, ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক, অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান খোঁজার বদলে স্থায়ী যুদ্ধের পথে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর মার্চের শুরুতে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে প্রণালিটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকে পার হতে না দেওয়ার পাশাপাশি এমন চেষ্টা করা জাহাজে মাঝেমধ্যে রকেট হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকার দাবি করছে। ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিরাপদে পার করে দিচ্ছে।
যুদ্ধের আগে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি জাহাজ চলাচল করত। যুদ্ধের সময় তা কমে দৈনিক গড়ে মাত্র সাতটিতে নেমে এসেছে।
হরমুজ প্রণালি ভবিষ্যতে কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ এসলামি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে এমন একটি পরিকল্পিত সংঘাত চালিয়ে যেতে চাইছে, যার লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভুল হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এখন বিক্ষিপ্ত হামলার মতো পদক্ষেপ অঞ্চলটির উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নিগার মোরতাজাভির মতে, সমঝোতা স্মারক ভেঙে যাওয়ার পর নতুন করে উত্তেজনা বাড়া ছিল অনিবার্য।
তিনি বলেন, ওয়াশিংটন যদি আবার সমঝোতা স্মারকে ফিরে আসে, তেহরানও তাতে ফিরতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপকে অগ্রাধিকার দিলে ইরানও উত্তেজনা বাড়াতে পারে। তাঁর মতে, উত্তেজনা কমানোর সবচেয়ে স্পষ্ট পথ হলো দুই পক্ষেরই সমঝোতা স্মারকে ফিরে যাওয়া।
মোরতাজাভি আরও সতর্ক করেছেন, দুই পক্ষই হয়তো মনে করতে পারে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। কিন্তু প্রতিবার পাল্টাপাল্টি হামলা হলে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে।
ইরানে নিয়মিত বা মাঝেমধ্যে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কত দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মার্কিন বাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে আসার জল্পনার পাশাপাশি যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্যও ট্রাম্পকে দিতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। পেট্রলের দাম বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছে। এ বছর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হলেও বর্তমানে দুই দেশের অগ্রাধিকার এক নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত মাসে আবারও বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে তেহরান বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় কমানো। এ অবস্থায় ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের কথিত ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ কৌশল বাস্তবায়িত হলেও তা সংঘাত কমাবে, নাকি নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াবে—এ প্রশ্ন এখনো অনিশ্চিত। বিশ্লেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
