স্বামীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা করেছিলেন কক্সবাজারের মহেশখালীর ফাতেমা বেগম। পরে সেই মামলার এক আসামির মায়ের করা পাল্টা মামলায় ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ সাত দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে তাঁকে। এ সময় তাঁর দুই শিশুসন্তানকে এতিমখানায় রাখতে হয়।
ফাতেমার বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের প্রতিবেদনে যাঁদের সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজন দাবি করেছেন, তাঁরা ওই মামলায় কোনো সাক্ষ্য দেননি। এমনকি তাঁদের নাম সাক্ষী হিসেবে কীভাবে এসেছে, সে বিষয়েও তাঁরা কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
ফাতেমা বেগম কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোমের বাসিন্দা। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান।
ফাতেমার স্বামী মুহাম্মদ কাশেম পেশায় জেলে ছিলেন। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল মহেশখালীর কুতুবজোমের কবির বাজার এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরদিন ফাতেমা থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় ১০ জনকে আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মো. রাসেল।
কাশেম হত্যার পর তাঁর রক্তাক্ত ছবি, স্বজনদের আহাজারি ও শিশুদের কান্নার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ক্ষোভ তৈরি হয়। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা রাসেলের বসতবাড়িতে তখন ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
কাশেম হত্যার মামলার পর ফাতেমাকে আসামিদের স্বজনেরা ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ৬ মে মহেশখালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বলেও জানা যায়।
এরপর ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট কাশেম হত্যা মামলার আসামি রাসেলের মা নুর জাহান বেগম মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি নালিশি দরখাস্ত করেন। সেখানে অভিযোগ করা হয়, ২৪ মে সকাল আটটার দিকে ফাতেমা, তাঁর মা, তিন ভাই, মামা ও ছোট বোনসহ সাতজন রাসেলের মায়ের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করেন।
আদালত অভিযোগটি তদন্তের জন্য মহেশখালী থানাকে নির্দেশ দেন। মামলাটির তদন্ত করেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাহেরুল ইসলাম। তিনি ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাদীপক্ষের দেওয়া সাতজন সাক্ষীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন, বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে থাকা নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের প্রত্যেকের দাবি, তাঁরা এই মামলায় কোনো সাক্ষ্য দেননি। তাঁদের নাম সাক্ষী হিসেবে কীভাবে প্রতিবেদনে এসেছে, সেটিও তাঁরা জানেন না বলে জানান।
তাঁদের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘরবাড়ি ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। তবে ২৩ এপ্রিল কাশেম হত্যার দিন এলাকায় উত্তেজনার মধ্যে রাসেলের বাড়িঘরে ভাঙচুর হয়েছিল। তাঁদের দাবি, ওই ঘটনায় কাশেমের পরিবারের কেউ জড়িত ছিলেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম ও মমতাজ বেগমসহ কয়েকজনও ২৪ মে কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, কাশেম হত্যার পর তাঁর পরিবারকে চাপের মধ্যে রাখতে এবং প্রতিশোধ নিতে ফাতেমার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করা হয়েছে।
মামলার বাদী নুর জাহান বেগমের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাঁকে এলাকায় পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁদের বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, আদালতে দেওয়া অভিযোগের তদন্তে বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের বাইরে অন্য কারও সাক্ষ্য নেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাটি এক বছর আগের হওয়ায় এখন তাঁর সব তথ্য মনে নেই; নথি দেখে বিষয়টি বলতে হবে। বর্তমানে তিনি মহেশখালীর মাতারবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত।
মহেশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রতুল কুমার শীল বলেন, ভাঙচুরের মামলাটির বিস্তারিত তাঁর মনে নেই। বিষয়টি জেনে পরে জানাবেন। তাঁর ভাষ্য, সব সাক্ষীর জবানবন্দি একই ধরনের হলে বিষয়টি আদালতের নজরে আসার কথা এবং এ বিষয়ে আদালত ব্যবস্থা নেবেন।
রাসেলের মায়ের করা মামলায় গত ৩১ আগস্ট রাতে ফাতেমা, তাঁর শাশুড়ি রাশেদা বেগম এবং নাছিমা আকতার নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ১ সেপ্টেম্বর তাঁদের আদালতে হাজির করা হলে রাশেদা ও নাছিমা জামিন পান। তবে ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ ফাতেমাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
রাশেদা বেগমের ভাষ্য, গ্রেপ্তারের সময় তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাঁদের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। জামিন পাওয়ার পরও কাশেম হত্যা মামলার আসামিদের স্বজনেরা তাঁদের হুমকি দিচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মহেশখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইনের আদালত গতকাল সোমবার দুপুরে ফাতেমার জামিন মঞ্জুর করেন। তাঁর আইনজীবী মো. আনছার জানান, এক হাজার টাকা বন্ডে ফাতেমার জামিন হয়েছে।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহমুদুল হক জানান, ফাতেমা স্বামীকে হারানোর পর শাশুড়ি ও তিন সন্তানকে নিয়ে ছোট তিন কক্ষের একটি মাটির দেয়াল ও টিনের চালের ঘরে থাকতেন। তাঁর বড় মেয়ে রাজমিন আকতার চতুর্থ শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে মিশকাত জান্নাত প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।
ফাতেমা কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর দুই মেয়েকে কুতুবজোমের তাজিয়াকাটা সুমাইয়া (রা.) এতিমখানায় রাখা হয়।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল বলেন, ২০২৫ সালের ২৪ মে এলাকায় কোনো ঘরবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। তবে কাশেম হত্যার পর উত্তেজিত লোকজন রাসেলের পরিবারের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছিলেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
শেখ কামালের ভাষ্য, নিহত কাশেম ও আসামি রাসেল আত্মীয়। সামান্য টাকার বিষয়কে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। তাঁর দাবি, কাশেম হত্যা মামলায় তাঁর পরিবারকে দুর্বল করতেই পাল্টা মামলাটি করা হয়েছে। সেই মামলায় ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ ফাতেমাকে কারাগারে থাকতে হয়েছে।
