বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা বিলের লাল শাপলার সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছরই বাড়ছে পর্যটকের আনাগোনা। আর পর্যটকদের এই উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে বদলে যাচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতিও। নৌকার মাঝি, খাবারের দোকানি, অটোরিকশাচালক থেকে শুরু করে শাপলা সংগ্রহকারী—বিলকে ঘিরে নানা পেশার মানুষের আয় বাড়ছে।
বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তরে সাতলা ইউনিয়নে সাতলা বিলের অবস্থান। লাল শাপলার জন্য পরিচিত এই বিলের প্রকৃত আয়তন প্রায় ২০০ একর। তবে বর্ষাকালে আশপাশের গ্রাম ও প্লাবনভূমিসহ প্রায় ১০ হাজার একর জলাভূমি শাপলায় ঢেকে যায়।
সারা বছর বিলে পানি থাকলেও বর্ষায় এর পরিবেশ বদলে যায়। জুলাই থেকে লাল শাপলা ফুটতে শুরু করে এবং নভেম্বর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে শাপলার আধিপত্য থাকে। লালের পাশাপাশি সাদা ও বেগুনি শাপলাও দেখা যায়, তবে সেগুলোর সংখ্যা কম।
শাপলা ফোটার মৌসুমে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার পর্যটক সাতলা বিলে আসেন বলে স্থানীয় নৌকার মাঝিরা জানিয়েছেন। শুক্র ও শনিবার পর্যটকের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়। চারটি স্থানে পর্যটকদের ঘোরাতে অর্ধশতাধিক নৌকা চলাচল করে।
নৌকার মাঝি চয়ন হাওলাদার বলেন, শাপলা ফোটার সময়ে প্রতিদিনই অনেক মানুষ আসেন। পর্যটক বাড়লে নৌকা চালানোর পাশাপাশি খাবারের দোকান ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির ব্যবসাও বাড়ে। স্থানীয় মাঝিদের হিসাবে, এসব নৌকা থেকে প্রতিদিন সম্মিলিতভাবে ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা আয় হয়।
তবে সাতলা বিল শুধু পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল নয়। স্থানীয় অনেক পরিবারের জীবিকার সঙ্গেও শাপলা সংগ্রহের বিষয়টি জড়িত। ৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে বিলের পানিতে শাপলা সংগ্রহ করছিলেন গীতা রানী দাস ও তাঁর মেয়ে শর্মিলা দাস। গীতা রানী জানান, মা-মেয়ে মিলে শাপলা সংগ্রহ করে পাইকারদের কাছে প্রতি মুঠো পাঁচ টাকা দরে বিক্রি করেন। এতে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। বর্ষার তিন-চার মাস শাপলা বিক্রি করেই তাঁদের সংসার চলে।
স্থানীয় শতাধিক পরিবার শাপলা সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত। বিল থেকে সংগ্রহ করা শাপলা উজিরপুর, আগৈলঝাড়া, গৌরনদী, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ ও বরিশাল শহরের বিভিন্ন বাজারে যায়। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া এবং রাজধানীর বাজারেও সাতলার শাপলা পৌঁছে যায়।
পর্যটনের কারণে বিলের আশপাশের খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচলও বাড়ে। স্থানীয় এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী জানান, পর্যটকের ভিড় বাড়লে খাবারের বিক্রিও বাড়ে। বিশেষ করে ছুটির দিনে দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসেন। এতে স্থানীয় কয়েকজনের সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়।
তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আবদুর রহিমের অভিযোগ, পর্যটক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরি করতে আসা মানুষের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন অপচনশীল বর্জ্য বিলের পরিবেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিঙ্কন বায়েন বলেন, সাতলার শাপলা বিলকে মানসম্মত ও পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য যাতে বিলে না ফেলা হয়, তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সাতলা বিলকে পর্যটকবান্ধব করে তুলতে উপজেলা প্রশাসনও উদ্যোগ নিয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১৫ লাখ টাকা এবং চলতি বছর আরও ৫ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পটিবাড়ি ও মুড়িবাড়িতে দুটি ভিউ পয়েন্ট তৈরির কাজ চলছে। প্রথম পর্যায়ে প্রবেশপথ, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণ করা হচ্ছে।
পর্যায়ক্রমে পর্যটকদের বসার স্থান, নিরাপদ নৌযান চলাচল, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই সাতলার শাপলা বিলকে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য যাতে বিলে না ফেলা হয়, সে জন্য প্রতিটি নৌকায় একটি করে বর্জ্য ফেলার ঝুড়ি দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় উপজেলা প্রশাসনের একাধিক মনিটরিং টিমও কাজ করছে।
ফলে একসময় স্থানীয় মানুষের কাছে মূলত জলাভূমি ও জীবিকার জায়গা হিসেবে পরিচিত সাতলা বিল এখন পর্যটনের কারণেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
