ডিওডোরেন্ট ও অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ব্যবহারে কি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়—বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা
গরম আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম কিংবা মানসিক চাপ—বিভিন্ন কারণে মানুষের শরীরে ঘাম হওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তবে শরীরের দুর্গন্ধ এড়াতে এবং সতেজ অনুভব করতে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন ডিওডোরেন্ট বা অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঘাম নিয়ন্ত্রণ বা দমন করা কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর? এ বিষয়ে বিজ্ঞান কী বলছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণভাবে বগলের ডিওডোরেন্ট বা অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ব্যবহার অধিকাংশ মানুষের জন্য নিরাপদ। তবে ঘামের ভূমিকা, বিভিন্ন পণ্যের কার্যকারিতা এবং শরীরের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
মানবদেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ঘাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে ঘাম বাষ্পীভূত হওয়ার মাধ্যমে তাপ বের করে দেয়, ফলে দেহ স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের ঘাম ঝরানোর ক্ষমতা অনেক প্রাণীর তুলনায় উন্নত। তীব্র গরমেও এটি শরীরকে কার্যকরভাবে ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করে।
ঘাম শুধু শারীরিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেই নয়, মানুষের স্বাভাবিক গন্ধ বা শরীরের নিজস্ব রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। এই গন্ধের সঙ্গে শরীরের তেলগ্রন্থি, রক্তে থাকা বিভিন্ন উপাদান এবং ত্বকের জীবাণু পরিবেশের সম্পর্ক রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিওডোরেন্ট এবং অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট এক নয়।
অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট সাধারণত অ্যালুমিনিয়ামভিত্তিক উপাদান ব্যবহার করে ঘামগ্রন্থির পথ সাময়িকভাবে সংকুচিত বা বন্ধ করে দেয়, ফলে নির্দিষ্ট স্থানে ঘামের পরিমাণ কমে যায়।
অন্যদিকে ডিওডোরেন্ট ঘাম বন্ধ করে না। বরং ত্বকে থাকা দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম কমিয়ে বা সুগন্ধি উপাদান ব্যবহার করে দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ করে।
বহু বছর ধরে অ্যান্টিপারস্পিরেন্টে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম নিয়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্বেগ দেখা গেছে। বিশেষ করে স্তন ক্যানসার বা আলঝেইমার রোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে নানা দাবি প্রচলিত রয়েছে।
তবে গবেষকদের মতে, এ বিষয়ে পরিচালিত বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অ্যান্টিপারস্পিরেন্টের অ্যালুমিনিয়াম ও এসব রোগের মধ্যে নির্ভরযোগ্য কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। বর্তমানে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের দাবি সমর্থন করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, না।
মানবদেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী প্রধান ঘামগ্রন্থি শরীরের প্রায় সব জায়গাজুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে। বগলে থাকা বিশেষ ধরনের ঘামগ্রন্থি মূলত এমন ঘাম তৈরি করে, যা ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে এসে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করতে পারে।
ফলে বগলের কিছু ঘামগ্রন্থির কার্যক্রম কমিয়ে দিলেও শরীরের সামগ্রিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে না।
সাম্প্রতিক সময়ে ‘হোল-বডি ডিওডোরেন্ট’ বা পুরো শরীরে ব্যবহারের জন্য তৈরি বিভিন্ন পণ্য বাজারে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
তবে ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের অধিকাংশ অংশের ঘাম সাধারণত দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে না। নিয়মিত গোসল ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে বাহু, পা বা শরীরের অন্যান্য স্থানে আলাদা ডিওডোরেন্ট ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না।
তবে বগল বা কুঁচকির মতো স্থানে, যেখানে বিশেষ ধরনের ঘামগ্রন্থি বেশি থাকে, সেখানে এ ধরনের পণ্য কার্যকর হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে অতিরিক্ত ঘামের সমস্যাকে ‘হাইপারহাইড্রোসিস’ বলা হয়। এ অবস্থায় শরীর প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ঘাম উৎপন্ন করে।
এ ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক যোগাযোগে অসুবিধা তৈরি হতে পারে। অনেকের পোশাক ভিজে যায়, হাতের তালুতে অতিরিক্ত ঘামের কারণে কাজ করতেও সমস্যা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ ডিওডোরেন্ট এ সমস্যার সমাধান নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ ওষুধ, চিকিৎসা পদ্ধতি কিংবা বোটক্স থেরাপির মতো সমাধান গ্রহণ করা যেতে পারে।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের কোনো বিশেষ সমস্যা নেই, তাদের জন্য নিয়মিত গোসল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বগলে ডিওডোরেন্ট বা অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ব্যবহারই যথেষ্ট।
তবে অতিরিক্ত ঘাম, তীব্র দুর্গন্ধ বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে নিজে নিজে বিভিন্ন প্রসাধনী ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ঘাম মানুষের শরীরের একটি অপরিহার্য ও উপকারী প্রক্রিয়া। এটি দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে ডিওডোরেন্ট বা অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ব্যবহার অধিকাংশ মানুষের জন্য নিরাপদ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পণ্য ব্যবহার করা গেলেও অতিরিক্ত ঘামের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
