স্পেসএক্সের স্টারশিপে জায়গা কিনে নতুন চন্দ্র পরিবহন সেবা চালু করছে জাপানের আইস্পেস
মহাকাশ গবেষণায় নতুন এক দিগন্ত উন্মোচনের উদ্যোগ নিয়েছে জাপানি মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইস্পেস। প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি ‘রাইড-শেয়ার’ ভিত্তিক চন্দ্র পরিবহন ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম খরচে নিজেদের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বা পেলোড চাঁদে পাঠাতে পারবে। এ লক্ষ্যে আইস্পেস ২০৩০ সালের একটি স্টারশিপ মিশনের জন্য স্পেসএক্সের কাছ থেকে কার্গো পরিবহনের জায়গা সংরক্ষণ করেছে।
মহাকাশ খাতে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক আগ্রহের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে চন্দ্র অভিযানে অংশগ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে চাঁদে গবেষণা, সম্পদ অনুসন্ধান এবং অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন পরিবহন ব্যবস্থার চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
আইস্পেস জানিয়েছে, তাদের পরিকল্পিত মডেলে একটি মহাকাশযানে একাধিক গ্রাহকের পেলোড একসঙ্গে বহন করা হবে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে পুরো একটি মহাকাশযান ভাড়া নিতে হবে না; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ব্যবহার করেই চাঁদে সরঞ্জাম পাঠানো সম্ভব হবে।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিদেয়ারি কামিয়া এই ব্যবস্থাকে ‘চাঁদগামী বাস সেবা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, বড় মহাকাশযানটি যাত্রীবাহী বাসের মতো কাজ করবে, আর আইস্পেসের নিজস্ব ল্যান্ডারগুলো হবে ট্যাক্সির মতো, যা নির্দিষ্ট গন্তব্যে মালামাল বা যন্ত্রপাতি পৌঁছে দেবে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০৩০ সালের স্টারশিপ মিশনে প্রায় ৫০০ কেজি কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে তারা প্রায় ৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এই সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ চন্দ্রযানও তৈরি করা হবে, যেখানে বিভিন্ন গ্রাহকের পেলোড একসঙ্গে বহনের ব্যবস্থা থাকবে।
মহাকাশ শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতের চন্দ্র বাণিজ্যের জন্য একটি নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করতে পারে, যা মহাকাশ পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।
আইস্পেসের চন্দ্র অভিযাত্রা সহজ ছিল না। ২০২৩ এবং ২০২৫ সালে দুটি পৃথক চন্দ্র অবতরণ মিশনে অংশ নিলেও শেষ মুহূর্তে অবতরণ প্রক্রিয়ায় ব্যর্থতার মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তারা আরও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে ‘আল্ট্রা’ সিরিজের তিনটি নতুন ল্যান্ডার চাঁদে পাঠানো। এর মধ্যে একটি মিশন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার কমার্শিয়াল লুনার পেলোড সার্ভিসেস (সিএলপিএস) কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে চাঁদকে কেন্দ্র করে গবেষণা, খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং দীর্ঘমেয়াদি মানব উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা আরও জোরদার হবে। সেই প্রেক্ষাপটে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইস্পেসের প্রধান নির্বাহী তাকেশি হাকামাদা মনে করেন, স্পেসএক্সের সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতের চন্দ্র অর্থনীতিতে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি আকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও মহাকাশ অভিযানে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে।
অন্যদিকে স্পেসএক্সের বাণিজ্যিক বিক্রয় বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টেফানি বেডনারেক বলেছেন, এই ধরনের উদ্যোগ চাঁদে যাতায়াতকে আরও সহজলভ্য করবে এবং নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে।
শুধু আইস্পেস নয়, নাসাও ২০২৮ সালে আর্টেমিস কর্মসূচির আওতায় স্টারশিপ ব্যবহার করে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মহাকাশ স্টার্টআপ অ্যাস্ট্রোল্যাব ভবিষ্যতের একটি স্টারশিপ মিশনে নিজেদের চন্দ্র রোভার পাঠানোর জন্য আগাম জায়গা সংরক্ষণ করেছে।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, চাঁদকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে এবং আগামী বছরগুলোতে মহাকাশ অর্থনীতির নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
মহাকাশ গবেষণাকে সীমিত সংখ্যক রাষ্ট্র বা বড় প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি থেকে বের করে আরও অংশগ্রহণমূলক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে ‘চন্দ্র রাইড-শেয়ার’ মডেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং ব্যয় কমে আসার ফলে ভবিষ্যতে চাঁদে গবেষণা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
