মনোযোগের ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তাজনিত সমস্যা (ADHD) নিয়ে জীবনযাপন করা অনেক নারীর জন্য মাসিকের সময়টা বিশেষভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাজ্যে পরিচালিত এক নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ঋতুচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তন ADHD-এর উপসর্গকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে।
লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি ও কিংস কলেজের গবেষকেরা এ বিষয়ে প্রথমবারের মতো একটি বিশেষ গবেষণা পরিচালনা করছেন। এতে ADHD-তে আক্রান্ত এবং নিয়মিত ওষুধ গ্রহণকারী ৫০ জন নারী অংশ নিয়েছেন। তারা নিজেদের ঋতুচক্র, হরমোনের পরিবর্তন এবং ADHD-সংক্রান্ত উপসর্গের তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করছেন।
৩০ বছর বয়সী শিক্ষাসহকারী লায়লা করনোটা ছোটবেলা থেকেই ADHD-তে ভুগছেন। দৈনন্দিন কাজের জন্য তিনি মোবাইলে একাধিক অ্যালার্ম ব্যবহার করেন। ঘুম থেকে ওঠা, পোশাক পরা কিংবা কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি—প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা অ্যালার্ম তার রুটিনের অংশ।
তবে মাসিকের সময় ঘনিয়ে এলে সেই নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই হারিয়ে যায় বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, তখন মনে হয় যেন সবকিছু সামলানোর চেষ্টা করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী হেলোইজ জানান, ADHD নিয়ন্ত্রণে তিনি রিটালিন নামের ওষুধ ব্যবহার করেন, যা তাকে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু মাসিক চলাকালে সেই ওষুধ অনেক সময় আগের মতো কার্যকর হয় না। গবেষণায় অংশ নেওয়ার পরই তিনি বুঝতে পারেন যে হরমোনগত পরিবর্তনের সঙ্গে তার উপসর্গের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. স্যালি কাবিনের মতে, নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের ওঠানামা ADHD-এর উপসর্গকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে মাসিক শুরুর আগে যখন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিনের কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে, ফলে মনোযোগের সমস্যা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি বলেন, এ সময় কিছু নারী অতিরিক্ত খাওয়া, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়তে পারেন।
লায়লাও স্বীকার করেন যে মাসিকের সময় তার অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায় এবং সেই তাড়না নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষকদের মতে, অতীতে ADHD-কে মূলত শিশু ও ছেলেদের সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের মধ্যে এই অবস্থার উপস্থিতি ও এর প্রভাব নিয়ে সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রয়্যাল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টসের ডা. ক্যাথরিন ডারকিন বলেন, ADHD-এর উপসর্গ নারীদের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। ফলে অনেক নারী দীর্ঘদিন সমস্যায় ভোগার পর এখন চিকিৎসা ও মূল্যায়নের জন্য এগিয়ে আসছেন।
গবেষণার প্রধান একাডেমিক ডা. জেসিকা অ্যাগনিউ-ব্লেইসের মতে, নারীদের ADHD, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হরমোনের প্রভাব নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। মেনোপজ ও পেরিমেনোপজের মতো বড় হরমোনগত পরিবর্তন ADHD-এর ওপর কী প্রভাব ফেলে, সে বিষয়েও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
গবেষণায় অংশ নিয়ে লায়লা নিজেকে অনেকটা স্বস্তি বোধ করছেন। তার মতে, একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আরও অনেক নারী যাচ্ছেন—এটি জানা মানসিকভাবে সহায়ক এবং নিজের অবস্থাকে বুঝতে সাহায্য করে।
