মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। টানা অষ্টম রাতের মতো যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর কুয়েত ও বাহরাইনের বিভিন্ন স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার এক পর্যায়ে একটি বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে আগুন ধরে যায়। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে দুটি জাহাজ আটকে দেওয়ার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
রোববার প্রকাশিত বিভিন্ন সরকারি বিবৃতি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়েত ও বাহরাইন উভয় দেশই একাধিক দফা ইরানি হামলার মুখোমুখি হয়েছে। দুই দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে। চলতি মাসে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় এই দেশগুলো ইরানের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যা কার্যত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় হামলাকে “জঘন্য ইরানি আগ্রাসন” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে বাহরাইনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের “বিশ্বাসঘাতকতামূলক” হামলা প্রতিহত করেছে।
ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, রোববারের একটি অভিযানে কুয়েতের ক্যাম্প আল-আদিরিতে অবস্থিত মার্কিন গোলাবারুদ গুদাম এবং আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানি সেনাবাহিনী জানায়, দেশের জনগণকে “ইরান ও মানবতার শত্রুদের” বিরুদ্ধে রক্ষায় তাদের সদস্যরা দৃঢ় অবস্থানে থাকবে।
এদিকে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, জর্ডানের আকাবা শহরের দিকে একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। জর্ডানে সতর্কসংকেত বেজে ওঠার খবরও পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ও জর্ডানের প্রতিরক্ষা বাহিনী যৌথভাবে ওই ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
ইরানের সর্বশেষ হামলার আগে শনিবার রাতে দেশটির বিভিন্ন স্থানে নতুন করে আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, জর্ডানে দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ী আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের জন্য সম্ভাব্য হুমকি কমানোও অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় হরমোজগান, খুজেস্তান প্রদেশ এবং কেশম দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। যদিও এসব হামলা আগের কয়েক রাতের তুলনায় কম তীব্র ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোববার পরে ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা অভিযোগ করে, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সংস্থাটি এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, “অনিরাপদ রুট” ব্যবহার করার চেষ্টা করায় দুটি জাহাজের গতিরোধ করা হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, জাহাজ দুটি একটি অনির্দিষ্ট “দুর্ঘটনার” সঙ্গে জড়িত ছিল।
গত মাসে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং ধাপে ধাপে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি হয়েছিল। তবে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থান এখনো বিপরীতমুখী। তেহরানের দাবি, নৌ চলাচল ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা অব্যাহত রাখার অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ইরানের একক নিয়ন্ত্রণের দাবি গ্রহণযোগ্য নয় এবং তারা ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নিজেদের অবরোধ পুনর্বহাল করেছে।
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতায় বর্তমানে ইরান তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অবস্থানে রয়েছে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারি থেকেই স্বার্থের এই অসমতা স্পষ্ট। তেহরানের শাসকগোষ্ঠী এটিকে অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নীতিগত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ করছে।”
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই সংঘাতের ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
