প্রতিদিন সকালে এক কাপ চা বা কফি দিয়ে দিন শুরু করা অনেকের অভ্যাস। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানীয়গুলো সরাসরি আয়রনের ঘাটতির কারণ না হলেও কখন এবং কীভাবে এগুলো পান করা হচ্ছে, তা শরীরে আয়রন শোষণের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যাদের আয়রনের ঘাটতি রয়েছে বা ঝুঁকিতে আছেন, তাদের জন্য এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
১৮ জুলাই প্রকাশিত এক নিবন্ধে ফোর্টিস মেমোরিয়াল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হেমাটোলজি, হেমাটো-অনকোলজি, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট ও সিএআর-টি সেল বিভাগের প্রধান পরিচালক ডা. রাহুল ভার্গব এ তথ্য তুলে ধরেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রজননক্ষম বয়সী প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে প্রায় একজন রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। অনেক ক্ষেত্রে এর প্রধান কারণ হলো আয়রনের ঘাটতি। শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী, নিরামিষভোজী এবং দীর্ঘদিন অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের শরীরে পর্যাপ্ত আয়রন বজায় রাখার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
খাবারের সঙ্গে চা-কফি পানের প্রভাব
ডা. ভার্গব জানান, অনেকেই খাবারের সঙ্গে বা খাবারের পরপরই চা কিংবা কফি পান করেন। এসব পানীয়তে থাকা প্রাকৃতিক যৌগ—পলিফেনল ও ট্যানিন—খাদ্য থেকে নন-হিম আয়রন শোষণ কমিয়ে দিতে পারে।
নন-হিম আয়রন মূলত ডাল, শিম, পালং শাক, বাদাম এবং আয়রন-সমৃদ্ধ সিরিয়ালে পাওয়া যায়। তাই আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চা-কফি পানের সময় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
পানীয়ের পাত্রও হতে পারে বিবেচনার বিষয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানীয় গ্রহণের জন্য ব্যবহৃত পাত্রের উপাদানও নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
- সিরামিক, চীনামাটি ও কাচের মগ সাধারণত নিরাপদ, কারণ এগুলো খাবার বা পানীয়ের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় না।
- নিম্নমানের বা ক্ষতিগ্রস্ত সিরামিক মগে সীসা বা ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
- স্টেইনলেস স্টিলের মগ দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য উপযোগী এবং পানীয়তে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয়রন মিশিয়ে দেয় না।
- তামার মগ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খাদ্য-নিরাপদ আবরণ থাকা জরুরি। অন্যথায় অম্লীয় পানীয়ের সংস্পর্শে তামা পানীয়তে মিশে যেতে পারে।
আয়রনের ঘাটতির লক্ষণ
আয়রনের অভাব সাধারণত ধীরে ধীরে তৈরি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেই এটিকে সাধারণ ক্লান্তি বা মানসিক চাপের ফল বলে মনে করেন। তবে কিছু লক্ষণ উপেক্ষা করা উচিত নয়—
- দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি
- শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া
- ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
- দৈনন্দিন কাজেও শ্বাসকষ্ট অনুভব করা
- ঘন ঘন মাথাব্যথা
- মনোযোগে ঘাটতি
- নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত চুল পড়া
চিকিৎসা না হলে বাড়তে পারে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা অনুযায়ী, চিকিৎসাহীন আয়রনজনিত রক্তস্বল্পতা শারীরিক কর্মক্ষমতা, শেখার ক্ষমতা, গর্ভাবস্থার ফলাফল এবং সামগ্রিক জীবনমানকে প্রভাবিত করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ বজায় রাখতে হৃদ্যন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, যা বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি ও হৃদরোগীদের জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আয়রন শোষণ বাড়ানোর সহজ উপায়
- আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন কমলা, পেয়ারা, আমলকি, টমেটো, ক্যাপসিকাম বা স্ট্রবেরি খাওয়া।
- আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে বা পরে চা-কফি পান করা।
- খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী পর্যাপ্ত আয়রনযুক্ত খাবার গ্রহণ করা।
- নিরাপত্তা মানসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য নির্মাতার তৈরি পানীয়ের পাত্র ব্যবহার করা।
রক্ত পরীক্ষা কেন জরুরি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়রনের ঘাটতির লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে থাকলে শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে সমস্যাটি আয়রনের ঘাটতি, অন্য কোনো ভিটামিনের অভাব, নাকি অন্য কোনো শারীরিক জটিলতার কারণে হচ্ছে।
ডা. ভার্গবের মতে, প্রিয় কফি বা চায়ের মগ সাধারণত আয়রনের মাত্রা কমিয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী নয়। বরং কী পান করা হচ্ছে, কখন পান করা হচ্ছে এবং ব্যবহৃত পাত্র কতটা নিরাপদ—এসব বিষয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দৈনন্দিন কিছু ছোট পরিবর্তন আয়রন শোষণ বাড়াতে এবং ভবিষ্যতে ঘাটতি প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
