ওয়াশিংটন | সিএনএন
প্রায় দুই দশকের আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি কার্যত নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ২৪ ঘণ্টা পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, সৌদি আরবকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ না দিলে চুক্তি কার্যকর হবে না। পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতিও দেওয়া হবে না।
ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে গত বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কয়েক মাস বিলম্বের পর দুই দেশ এই সমঝোতায় পৌঁছায় এবং এতে সৌদি আরব তাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিনই পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, চুক্তি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবকে অবশ্যই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে হবে। তাঁর প্রথম মেয়াদে সম্পাদিত এই চুক্তির মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল।
একই সঙ্গে ট্রাম্প স্পষ্ট করেন, চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হবে না। তাঁর এই ঘোষণায় সদ্য স্বাক্ষরিত চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, চুক্তি ঘোষণার আগেই ট্রাম্প অসন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ, জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট তাঁকে না জানিয়েই সেদিন চুক্তি ঘোষণা করতে যাচ্ছিলেন। হোয়াইট হাউস চেয়েছিল, ওই দিন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়া হোক। কিন্তু সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে অনুষ্ঠান চালিয়ে যান রাইট। পরে তিনি ফক্স বিজনেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও চুক্তি নিয়ে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, চুক্তিটি তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। কারণ, কংগ্রেসে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠানো বাকি ছিল। এ অবস্থায় আগেভাগে চুক্তি ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা ক্ষুব্ধ হন।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা এর দায় জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন।
চুক্তি ঘোষণার পর রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সমালোচনা ট্রাম্পের অবস্থানকে আরও কঠোর করে তোলে। ফক্স নিউজ ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর সম্পাদকীয়তে প্রশ্ন তোলা হয়—ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত ছাড়াই কেন সৌদি আরবের সঙ্গে এমন গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক চুক্তি করা হলো। তারা উল্লেখ করে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও একই ধরনের আলোচনায় এমন শর্ত আরোপের পক্ষে ছিলেন।
হোয়াইট হাউস অবশ্য দাবি করেছে, সৌদি আরবের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নতুন কোনো শর্ত নয়। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই এ অবস্থান বজায় রেখেছেন। তবে সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা দুটি সূত্র জানায়, শেষ মুহূর্তে এই শর্ত যুক্ত করা হবে—এমন তথ্য পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে কাজ করা মার্কিন আলোচকরাও আগে জানতেন না।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স এক বিবৃতিতে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে যে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি হচ্ছে, তা সৌদি আরবের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার ওপর নির্ভরশীল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্বালানি দল এ ব্যাপারে পুরোপুরি একমত। এটাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।”
পরে প্রেস সচিব ক্যারোলাইন লেভিটও বলেন, ট্রাম্প নতুন শর্ত ঘোষণার আগে বা পরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেননি। তাঁর ভাষ্য, এটি প্রেসিডেন্টের দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং ভবিষ্যতেও সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় হোয়াইট হাউসের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বেন ডিটারিখ বলেন, “আলোচনা থেকে শুরু করে চুক্তি ঘোষণার প্রতিটি ধাপেই হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। ভিন্ন কোনো দাবি সত্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক চুক্তি এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডস—উভয়েরই মূল উদ্দেশ্য সংঘাত নয়, বরং বাণিজ্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে এই বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। প্রায় দুই দশক আগে দুই দেশ প্রথম এ ধরনের চুক্তির ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। গত বছরের অক্টোবরে দুই দেশের জ্বালানিমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, তারা একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছেন।
পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসে একটি বিশেষ ছাড়-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অ্যাডিশনাল প্রটোকলে সৌদি আরবকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত রাখা হয়নি। এরপরও কয়েক মাস চুক্তির অগ্রগতি থেমে ছিল। সিএনএনের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ এবং কংগ্রেসে চুক্তি আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় ট্রাম্প অনুমোদন দিতে বিলম্ব করেছিলেন।
সূত্রগুলোর দাবি, গত সপ্তাহের শেষ দিকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টের সম্মতি পেয়েছেন বলেই চুক্তি ঘোষণার প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। মঙ্গলবার রাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম জানায়, ট্রাম্প চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছেন। তবে আরেকটি সূত্রের মতে, প্রেসিডেন্ট কেবল একটি প্রাথমিক সমঝোতায় সম্মতি দিয়েছিলেন, চূড়ান্ত চুক্তি ঘোষণা করার অনুমতি দেননি।
চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার পর ওয়াশিংটনে আলোচনা শুরু হয়, শেষ মুহূর্তে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ বিষয়ে প্রভাব খাটিয়েছেন কি না। সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা ইসরায়েলের দুটি সূত্রের দাবি, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যাতে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তিতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে হোয়াইট হাউস এই দাবি অস্বীকার করেছে। প্রেস সচিব ক্যারোলাইন লেভিট জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
চুক্তির সম্ভাব্য শর্ত প্রকাশ্যে আসার পর পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আইএইএর অতিরিক্ত পরিদর্শন ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ না থাকাও উদ্বেগের বিষয়।
অন্যদিকে চুক্তির সমর্থকদের যুক্তি, সৌদি আরব যেকোনোভাবেই নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে চায়। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অংশীদার হলে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত তদারকিতে ওয়াশিংটনের কিছুটা প্রভাব বজায় থাকবে। অন্যথায় চীন বা রাশিয়া সেই সুযোগ নিতে পারে।
এদিকে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তির মতে, চুক্তি স্থগিত বা নতুন শর্ত আরোপের সিদ্ধান্তে রক্ষণশীল মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর সমালোচনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ফক্স নিউজে প্রকাশিত মন্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
