ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, যুদ্ধবিরোধী জনমত, সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়েই এ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
হোয়াইট হাউসে উপদেষ্টাদের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকের পর ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের নতুন হামলার সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর বাড়তে থাকা চাপ এবং দেশের ভেতরে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা তাঁর সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক শক্তি বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, তবু বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য বলছে দেশটি এখনো বড় পরিসরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। এমনকি অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতাও তারা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি দুটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (MEU) এবং ৮২তম বা ১০১তম এয়ারবোর্ন ইউনিটের কিছু অংশও ওই অঞ্চলে অবস্থান করছে।
তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্রদের হাতে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং টমাহক ল্যান্ড-অ্যাটাক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে, যা নতুন সামরিক অভিযান শুরুর ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষণে ট্রাম্পের সামনে তিনটি সম্ভাব্য সামরিক বিকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
১. বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়ানো
প্রথম বিকল্প হিসেবে আকাশপথে হামলা আরও জোরদারের কথা বলা হলেও এতে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু কমে আসায় হামলা বেসামরিক অবকাঠামোর দিকে গড়াতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু, সড়ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সংবাদমাধ্যমের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও ডেকে আনতে পারে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কাও রয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
২. স্থল অভিযান
দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে স্থল অভিযানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাসংখ্যা দিয়ে কার্যকর স্থল অভিযান পরিচালনা সম্ভব নয় বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল ব্যারি ম্যাককাফ্রে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির ইরানি উপকূল নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার সেনা প্রয়োজন হতে পারে, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই।
৩. সীমিত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার
তৃতীয় বিকল্প হিসেবে সীমিত পরিসরে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হলেও এটিকে সবচেয়ে বিপজ্জনক পথ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের পাশাপাশি ভয়াবহ মানবিক ও ভূরাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বায়ুমণ্ডলের বাইরে বিস্ফোরণ ঘটানো হলে সৃষ্ট ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস (EMP) বিস্তীর্ণ এলাকার আধুনিক ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা অকার্যকর করে দিতে পারে। আর ভূপৃষ্ঠে বিস্ফোরণ ঘটলে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব ইরানের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক বিকল্পের পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সাফল্য ঘোষণা করে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।
বিশ্লেষক ড. হারলান উলম্যান মনে করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পর্দার আড়ালের আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেব হয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমবে, বিশ্ববাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটও এড়ানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কূটনৈতিক সমাধান বাস্তবায়িত হলে ট্রাম্প তা নিজের রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবেও তুলে ধরতে পারবেন এবং একই সঙ্গে একটি সম্ভাব্য বৃহৎ যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে।
