ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক। তাঁর মতে, এই আন্দোলনের পর দেশের তরুণ সমাজ আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে এবং তারা পরিবর্তন আনার সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয়েছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সোনম ওয়াংচুক বলেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হওয়া আন্দোলন ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি নিজেও অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেন, যা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
তরুণদের গণবিক্ষোভের মুখে গত ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।
৫৯ বছর বয়সী এই শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী বলেন,
“তরুণেরা এখন আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী। এখন তারা জানে, চাইলে তারা যেকোনো পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। তারা এখন বুঝতে পেরেছে, অন্যায় বা অপছন্দের সবকিছু নীরবে মেনে নিতে তারা বাধ্য নয়।”
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া বড় গণআন্দোলনগুলোর অন্যতম ছিল ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে জুন ও জুলাই মাসজুড়ে চলা এই আন্দোলন। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে মূলত জেন–জি প্রজন্মের তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল বেশি।
দিল্লির তীব্র গরমের মধ্যে টানা ২৬ দিন অনশন করেন সোনম ওয়াংচুক। এ সময় তিনি শুধু লবণ ও পানি গ্রহণ করেন। অনশনের ফলে তাঁর ওজন ১১ কেজি কমে যায়, যদিও পরে ছয় কেজি ওজন ফিরে পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, অনশনের সময় দিল্লি পুলিশ তাঁকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের শেষ ছয় দিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ওয়াংচুক বলেন, সেখানে তাঁর মনে হয়েছিল তিনি হাসপাতালে নয়, কারাগারেই রয়েছেন।
ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়ার পর আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে এবং তা ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। অনশন শেষ করার পরদিনই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
আন্দোলনের পর মোদি সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি পরীক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগে নেতৃত্ব দিতে প্রযুক্তি খাতের এক বিলিয়নিয়ারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসজনিত মানসিক চাপে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ঘোষণাও দেয় সরকার।
ওয়াংচুকের মতে, ভারতের বেকারত্ব সমস্যার মূল কারণগুলোর একটি হলো বর্তমান পরীক্ষাব্যবস্থা। তিনি বলেন, অধিকাংশ পরীক্ষা বহু নির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) নির্ভর হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও একই পরীক্ষাকেন্দ্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে।
তিনি মনে করেন, ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক যোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে শিক্ষার মান যেমন উন্নত হবে, তেমনি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
ওয়াংচুক বলেন,
“আগামী ১৫ বছরে বিশ্ব এবং দেশ কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কে আগাম পরিকল্পনা ও দূরদর্শী চিন্তাভাবনা থাকা দরকার।”
তাঁর ভাষ্য, শিশুদের শেখানোর পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা গেলে এমন একটি দক্ষ কর্মশক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে, যেখানে একদিকে তরুণদের বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে বিভিন্ন খাত দক্ষ জনবলের সংকটে পড়বে না।
তবে ভারত সরকারের দাবি, দেশটিতে কর্মসংস্থান সংকট বা বেকারত্ব নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, তা অতিরঞ্জিত।
