সিলেটের বৈরাগী বাজারে হজরত ছাবাল শাহ্ (রহ.)-এর মাজারের বার্ষিক ওরসে গান গেয়ে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন উদীয়মান বাউল ও লোকশিল্পী পেহেলি ভৈরবী। শুক্রবার সকালে সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত নয়জনের মধ্যে তিনিও ছিলেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌর শহরের চণ্ডীবের উত্তরপাড়ায় নেমে এসেছে শোকের আবহ।
পেহেলি ভৈরবীর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স শুক্রবার বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে গ্রামের বাড়ির সড়কে পৌঁছালে স্বজন ও প্রতিবেশীরা সেখানে জড়ো হন। কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। মরদেহের পাশে বসে তাঁর মা রোজিনা বেগম বারবার বলতে থাকেন, ‘এত তাড়াতাড়ি কেমনে চইল্লা গেলি। আমার কী হইব? আমি কারে নিয়া থাকুম। কে আমারে গান শোনাইব।’
রোজিনা বেগম নিজেও সংগীতশিল্পী। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেয়েকে গান শেখাতেন এবং পেহেলি ভৈরবীর গানের জগতে প্রবেশের ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন প্রথম অনুপ্রেরণা। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত একটার দিকে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। রোজিনা বেগম বলেন, ‘রাত একটার সময় মেয়ের সঙ্গে কথা হইছে। বুঝতেই পারিনি, সকালে আর ওর সঙ্গে কথা বলতে পারব না।’
পেহেলি ভৈরবীর আসল নাম ইসরাত জাহান। তবে গান ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি পেহেলি ভৈরবী নামেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর ফেসবুক পেজেও এই নাম ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে অনুসারীর সংখ্যা অর্ধলক্ষাধিক।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০ বছর বয়সী পেহেলির বিয়ে হয়নি। তাঁর বাবা বাবুল মিয়া পেশায় ঠিকাদার। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। মায়ের উৎসাহে ছোটবেলা থেকেই গান শুরু করেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মঞ্চে গান করছিলেন। বাউল ও লোকগান ছিল তাঁর মূল পরিবেশনার ক্ষেত্র।
অল্প সময়ের মধ্যেই সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় পরিচিতি পান পেহেলি। বছরের বিভিন্ন সময়ে তাঁকে অনেক গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হতো। বৃহস্পতিবারও তিনি সিলেটের একটি অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়েছিলেন। সাধারণত একা অনুষ্ঠানে যেতেন না তিনি। কখনো মা, কখনো বাবা তাঁর সঙ্গে থাকতেন। এবার তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাবা বাবুল মিয়া। দুর্ঘটনায় তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ইউটিউবের বিভিন্ন চ্যানেলে পেহেলি ভৈরবীর গান প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কয়েকটি গানের দর্শকসংখ্যা ১০ লাখ বা তারও বেশি। একটি অ্যালবামও প্রকাশিত হয়েছে, যাতে ছিল ১০টি গান। পরিবারের সদস্যরা জানান, গত এক বছরে গান গেয়ে তিনি ভালো সম্মানী পেতে শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন সংগঠন থেকেও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।
পেহেলির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন সহশিল্পী, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা। সহশিল্পী উবায়দুল কাওয়াল বলেন, ‘পেহেলির গানের ধারা এক, আমারটা আরেক। ওর জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখে ভালো লাগত। এত অল্প বয়সে একজন বাউলশিল্পীর চলে যাওয়া মানে মনের গান গাওয়ার একজন মানুষ কমে যাওয়া।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পেহেলির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছেন তাঁর ভক্ত ও পরিচিতজনেরা। শেষবার অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানিয়ে দেওয়া তাঁর ফেসবুক পোস্টে অনেকে শোকবার্তা দিয়েছেন। শুভ সেন নামের একজন লিখেছেন, ‘প্রোগ্রামে দেখা হইলেই ভাইয়া কইয়া ডাক দিতেরে। তর ভাইয়া ডাকটা ভড্ড মিস করমু। পরপারে ভালো থাকিস রে বইন।’
একই দুর্ঘটনায় কুলিয়ারচরের সাইফুল ইসলামও নিহত হয়েছেন। পাঁচ বন্ধু মিলে সিলেট ভ্রমণে গিয়েছিলেন তাঁরা। সাইফুল আর ফিরতে পারেননি; বাকি চারজন ফিরেছেন, তবে তাঁদের মধ্যে দুজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সাইফুল ইসলামের বয়স ৫৫ বছর। তিনি পেশায় ঠিকাদার ছিলেন এবং রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কুলিয়ারচর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি সাইফুল এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার চার বন্ধুর সঙ্গে সিলেট ভ্রমণে যান সাইফুল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফারুকুল ইসলাম, জমরুত মিয়া, মো. রানা ও আবদুল লতিফ। আহত আবদুল লতিফ ও ফারুকুল ইসলাম বর্তমানে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ফারুকুল ইসলাম উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক।
আবদুল লতিফ জানান, শুক্রবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ৩০ থেকে ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সিলেট থেকে ছেড়ে যায়। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁর ভাষায়, ‘বাসে উঠেই আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। পরে দেখি, বাস সড়কের নিচে। আমাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর জানতে পারি, আমার বন্ধু সাইফুল ইসলাম আর বেঁচে নেই।’
সাইফুলের মৃত্যুর খবর কুলিয়ারচরে পৌঁছালে স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী ও পরিচিতজনেরা তাঁর বাড়িতে ছুটে আসেন। শোকের আবহ তৈরি হয় পুরো এলাকায়।
