পিত্তথলিতে পাথর বা গলস্টোন পরিপাকতন্ত্রের একটি পরিচিত সমস্যা। অনেকের শরীরে পাথর থাকলেও দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি তীব্র পেটব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস, পিত্তথলির প্রদাহ এমনকি অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
পিত্তথলি যকৃতের নিচে থাকা ছোট থলির মতো একটি অঙ্গ। সাধারণত এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার। যকৃত প্রতিদিন যে পিত্তরস তৈরি করে, পিত্তথলি সেটি সাময়িকভাবে জমিয়ে রাখে।
পিত্তরসে প্রধানত কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ ও বিলিরুবিন থাকে। এসব উপাদানের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হলে ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সেগুলো জমে শক্ত হয়ে পাথরে পরিণত হয়।
পিত্তরসে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, পিত্তথলি পুরোপুরি খালি না হওয়া, অতিরিক্ত বিলিরুবিনের উৎপাদন এবং পিত্তথলির সংক্রমণ বা প্রদাহ পাথর তৈরির অন্যতম কারণ।
পিত্তথলির পাথর সাধারণত তিন ধরনের।
কোলেস্টেরল পাথর: সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের পাথর তৈরি হয়।
পিগমেন্ট পাথর: বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে এ ধরনের পাথর হতে পারে। যকৃতের রোগ কিংবা নির্দিষ্ট কিছু রক্তরোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
মিশ্র পাথর: কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম ও বিলিরুবিনের সমন্বয়ে এ ধরনের পাথর তৈরি হয়।
পিত্তপাথরের ঝুঁকি বোঝাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রচলিত ‘৫এফ’ সূত্রের কথা বলা হয়—ফিমেল বা নারী, ফর্টি বা ৪০ বছরের বেশি বয়স, ফ্যাট বা অতিরিক্ত শরীরের ওজন, ফার্টাইল অর্থাৎ গর্ভধারণের সক্ষমতা এবং ফেয়ার বা ফর্সা ত্বক।
এ ছাড়া স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, গর্ভাবস্থা, ইস্ট্রোজেন-জাতীয় ওষুধ, পরিবারে পিত্তপাথরের ইতিহাস, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, কম ফাইবারযুক্ত খাদ্য, যকৃতের রোগ, হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া এবং বয়স বৃদ্ধিও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ভারতে আনুমানিক ৫ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো এক সময়ে পিত্তপাথর-সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে এ সমস্যা দুই থেকে তিন গুণ বেশি দেখা যায় এবং ৪০ বছরের পর ঝুঁকি বাড়ে। তরুণদের মধ্যেও পিত্তপাথরের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে; এর সঙ্গে স্থূলতা বৃদ্ধি, শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি ও অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড গ্রহণের মতো বিষয়গুলোকে সংশ্লিষ্ট কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনেকের ক্ষেত্রে অন্য কোনো কারণে আলট্রাসাউন্ড করার সময় ঘটনাক্রমে পিত্তথলির পাথর ধরা পড়ে। তবে পাথর উপসর্গ তৈরি করলে সাধারণত পেটের ওপরের ডান দিকে তীব্র ব্যথা হতে পারে। সেই ব্যথা কাঁধ বা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর তা বাড়তে পারে।
এ ছাড়া বমি, বদহজম, পেট ফাঁপা, গ্যাস জমা ও অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।
তবে জ্বর, কাঁপুনি, জন্ডিস, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, সাদা বা ফ্যাকাশে মল, তীব্র পেটব্যথা কিংবা একটানা বমি হলে বিষয়টি গুরুতর হতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পিত্তথলির পাথর শনাক্তে আলট্রাসাউন্ড সবচেয়ে প্রচলিত পরীক্ষাগুলোর একটি। এটি তুলনামূলক সহজ, কম খরচের এবং নির্ভুলভাবে পাথর শনাক্ত করতে পারে।
প্রয়োজনে রক্তের সিবিসি, লিভার ফাংশন টেস্ট, সিরাম বিলিরুবিন ও লিভার এনজাইম পরীক্ষা করা হয়। পিত্তনালিতে পাথর থাকার সন্দেহ হলে সিটি স্ক্যান বা এমআরসিপি করা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ইআরসিপি ব্যবহার করে পাথর শনাক্ত করার পাশাপাশি তা অপসারণও করা সম্ভব।
পিত্তথলিতে পাথর থাকলেও কোনো উপসর্গ না থাকলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকা যথেষ্ট হতে পারে।
তবে বারবার ব্যথা বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে অস্ত্রোপচার বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি পিত্তথলির পাথরের জন্য প্রচলিত ও মানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি। এ অস্ত্রোপচারে পুরো পিত্তথলি অপসারণ করা হয়।
ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচারে সাধারণত কাটাছেঁড়া ছোট হয়, ব্যথা ও রক্তপাত তুলনামূলক কম হতে পারে এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে এক বা দুই দিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া যায়।
পিত্তথলিতে তীব্র প্রদাহ, পিত্তথলি ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা, পিত্তনালিতে বাধা, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ বা সংক্রমণের মতো পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ওষুধের মাধ্যমে কোলেস্টেরলের ছোট পাথর গলানোর চেষ্টা করা যায়। তবে এই পদ্ধতি সবার জন্য কার্যকর নয়। চিকিৎসায় কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে এবং পরবর্তীতে আবার পাথর হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। এ কারণে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারকে তুলনামূলক স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পিত্তথলি অপসারণ নিয়ে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও পিত্তথলি না থাকলেও যকৃত পিত্তরস উৎপাদন করতে থাকে। সেই পিত্তরস সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছায়। ফলে পিত্তথলি অপসারণের পরও অনেক মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
পিত্তথলির পাথরের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সময়ে ব্যবস্থা না নিলে তীব্র প্রদাহ, পিত্তথলিতে ফোঁড়া, টিস্যু নষ্ট হওয়া, পিত্তথলিতে ছিদ্র, পিত্তনালিতে বাধার কারণে জন্ডিস এবং পিত্তনালিতে সংক্রমণ হতে পারে।
এ ছাড়া অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ ও অন্ত্রে প্রতিবন্ধকতার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে। পিত্তথলির ক্যানসারের ঝুঁকি বিরল হলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সব ক্ষেত্রে পিত্তপাথর পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে কিছু জীবনযাপনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, স্থূলতা এড়ানো এবং ধীরে ধীরে ওজন কমানো গুরুত্বপূর্ণ।
দ্রুত ওজন কমানোর এমন পদ্ধতি এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে, যাতে এক মাসে ২ থেকে ৪ কেজির বেশি ওজন কমে যায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ব্যায়াম করা এবং ফল, শাকসবজি, দানা শস্য ও ফাইবারসমৃদ্ধ সুষম খাবার গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ফাস্ট ফুড, ভাজাপোড়া খাবার, ঘি, মাখন, ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার কমানো এবং পর্যাপ্ত পানি পান করাও সহায়ক হতে পারে। ডায়াবেটিস থাকলে সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
পিত্তথলিতে পাথর হলেই অস্ত্রোপচার করতে হয়—এ ধারণা সঠিক নয়। উপসর্গহীন অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না।
আয়ুর্বেদিক বা ঘরোয়া উপায়ে পিত্তপাথর পুরোপুরি গলে যায়—এমন দাবির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। নিজের মতো করে চিকিৎসা শুরু করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আবার পিত্তথলি অপসারণ করলে সারা জীবন হজমের সমস্যা হবে—এ ধারণারও ভিত্তি নেই। অধিকাংশ মানুষ পিত্তথলি অপসারণের পর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
পেটের ওপরের ডান দিকে তীব্র ব্যথা হলে, বিশেষ করে ব্যথা ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হলে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। এর সঙ্গে জ্বর, বমি, জন্ডিস, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া বা গাঢ় রঙের প্রস্রাব দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পিত্তথলির পাথর অনেকের ক্ষেত্রে উপসর্গহীন থাকলেও একে অবহেলা করা উচিত নয়। স্বাস্থ্যকর ওজন, সুষম খাদ্য এবং নিয়মিত শরীরচর্চা ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। পেটের ওপরের ডান দিকে বারবার ব্যথা হলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আলট্রাসাউন্ড করানো উচিত।
দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনটির উৎসে লেখক হিসেবে ডক্টর হিমানীর নাম এবং পেশা হিসেবে রেডিয়েশন অঙ্কোলজিস্ট উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
