রয়টার্স
লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল–মানদেব প্রণালিতে মিসরীয় মালিকানাধীন একটি পণ্যবাহী জাহাজে সন্দেহভাজন হুতি হামলায় চার নাবিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি ও একজন ইন্দোনেশীয়। একই দিনে ওমান সাগরে ইরানের বন্দরগুলোর নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে পাঁচ মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার বাব আল–মানদেব প্রণালিতে মিসরীয় মালিকানাধীন পণ্যবাহী জাহাজ তিহামাহ-তে সন্দেহভাজন হুতি হামলার ঘটনা ঘটে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজে হুতিদের হামলায় এটিই প্রথম প্রাণহানির ঘটনা বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা সাবার দাবি, তিহামাহ সৌদি আরবের জন্য সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন করছিল। তবে হামলার বিষয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে উপসাগরীয় ওমান সাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ অমান্য করছিল এবং একাধিকবার সতর্ক করার পরও থামেনি।
পরে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার থেকে জাহাজটিকে লক্ষ্য করে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এতে জাহাজটির দিক পরিবর্তনের ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যায় বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
দুটি হামলার ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন ইরান যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারেও। মঙ্গলবার তেলের দাম আরও বেড়েছে এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই মঙ্গলবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে না নিলে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে না।
আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজাই বলেন, ইরানের জব্দ করা সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি লেবানন, গাজাসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে বলে জানান তিনি।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে দীর্ঘ সময় এ পথ বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ছয়টি জাহাজ চলাচল করেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন এ পথে সাধারণত ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত।
ইরানের এমন অবস্থানের আগে সোমবার নতুন একটি দাবি তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, গত ৫০ বছরের যুদ্ধ, হামলা ও বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তিদের জন্য ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
ইরান যুদ্ধের পুরো সময়ে ট্রাম্প কখনো সংঘাত আরও বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন, আবার কখনো দ্রুত শান্তিচুক্তির সম্ভাবনার কথা বলেছেন। সোমবার রাতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমান অনিশ্চয়তা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি একধরনের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার ক্ষেত্রে ইরানিরা খুবই ধূর্ত।
মোহসেন রেজাইয়ের বক্তব্যকে হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে ইরানের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডারের উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদিও মঙ্গলবার আরও সংঘাতের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে এবং নির্দেশ পেলে শত্রুর ভূখণ্ডে অভিযান চালানোর সক্ষমতা তৈরির কাজ করছে বিপ্লবী গার্ড।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে সংঘাতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। এর জবাবে ইরান ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এদিকে লোহিত সাগরের বাব আল–মানদেব ও হরমুজ—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথেই জাহাজ চলাচল কমেছে। যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে আরও বড় চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
