ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জেন–জি নেতৃত্বাধীন সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন শুধু রাজপথেই প্রভাব ফেলেনি, বদলে দিয়েছে অনেক তরুণের পারিবারিক সম্পর্কও। বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সমর্থক পরিবারের সন্তানদের কেউ দলীয় আদর্শ থেকে সরে এসেছেন, কেউ বাড়ি ছেড়েছেন, আবার কেউ পরিবারের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে দূরত্ব তৈরি করেছেন।
পাঞ্জাবের লুধিয়ানা থেকে ১৪ জুলাই নয়াদিল্লির আন্দোলনে যোগ দিতে রওনা হয়েছিলেন আইন বিভাগের শিক্ষার্থী কুনাল চৌধুরী। তিনি জানতেন, বাড়ি ছাড়ার পর দ্রুত ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। এর আগে ভারতের মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা নিট–ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ওই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ২০ জনের বেশি পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলন টানা ৩৬ দিন চলে। ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের ঘোষণা দিলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে সেখান থেকে চলে যান। তবে কুনাল থেকে যান। তাঁর ভাষায়, এই আন্দোলন তাঁর জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে। এমনকি আন্দোলনের শেষ পর্যায়ের আগে অন্য বিক্ষোভকারী ও অপরিচিত মানুষের সঙ্গে তিনি নিজের ১৯তম জন্মদিনও পালন করেন।
কুনালের পরিবার অবশ্য বিজেপি ও আরএসএসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। তাঁর বাবা জীবন চৌধুরী বিজেপি ও আরএসএসের সদস্য। কুনালও দিল্লির উদ্দেশে বাড়ি ছাড়ার আগপর্যন্ত আরএসএসের সদস্য ছিলেন। আন্দোলনের কর্মসূচির কারণে তিনি শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।
কুনাল বলেন, ‘কিন্তু যা হয়েছে, হয়েছে। চারপাশের পৃথিবীকে ভেঙে পড়তে দেখে চুপচাপ বসে থাকা এবং তা মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।’
আরএসএসের কার্যক্রম নিয়েও কুনালের তীব্র আপত্তি রয়েছে। তাঁর দাবি, সংগঠনটি মুসলিম ও দলিতদের প্রতি বিদ্বেষ শেখায়। আন্দোলনে ধর্ম, জাতপাত ও সামাজিক পরিচয়ের ভেদাভেদ না থাকায় তাঁর পরিবারের আপত্তি আরও বেড়েছিল। বিক্ষোভস্থলে মুসলিম তরুণ মোহাম্মদ জুনাইদসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে একসঙ্গে খাবার ও পানি বিতরণ করতে দেখা যায়।
কুনালের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গ তোলার পাশাপাশি নিজেকে বিজেপি কর্মীর ছেলে ও সাবেক আরএসএস সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। ভিডিওটি দেখার পর তাঁর বাবা বিজেপি ও আরএসএসের বিরুদ্ধে কিছু না বলতে তাঁকে সতর্ক করেন। কুনাল এখনো মা–বাবার সঙ্গে কথা বলেন, কিন্তু বাড়ি ফিরতে চান না। নিজের খরচ চালাতে চাকরি খুঁজছেন এবং পরে দূরশিক্ষণের মাধ্যমে আইন বিষয়ে ডিগ্রি শেষ করার পরিকল্পনা করছেন। বর্তমানে তিনি যন্তর মন্তরের কাছে একটি গুরুদুয়ারায় থাকছেন। আন্দোলন শেষ হওয়ায় খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে তাঁর এখন কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তাঁর মানিব্যাগও চুরি হয়েছে, যাতে টাকা ও পরিচয়পত্র ছিল।
২৪ বছর বয়সী প্রিয়া সিংয়ের বাবাও বিজেপির কট্টর সমর্থক। যন্তর মন্তরের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানালে বাবা তাঁকে মারধরের হুমকি দেন। তাই বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার সময় তিনি মুখ ঢেকে রাখতেন, যাতে ছবি বা ভিডিও দেখে বাবা তাঁকে শনাক্ত করতে না পারেন।
প্রিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ৫৫ বছর বয়সী বাবা একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এবং বিজেপির প্রতি তাঁর ‘অন্ধ বিশ্বাস’ রয়েছে। বিক্ষোভস্থলের একটি ভিডিওতে এক নারী বিক্ষোভকারীর ওপর পুলিশ কর্মকর্তার যৌন নিপীড়নের দৃশ্য দেখানোর পরও তাঁর বাবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ নেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সরকার নিষেধ করার পরও নারী বিক্ষোভকারীদের সামনের সারিতে থাকা উচিত হয়নি।
প্রিয়া বর্তমানে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পরিবারকে না জানিয়ে তিনি সেখানে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং ভর্তি হওয়ার পরও বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। বাবা বিষয়টি জানতে পেরে উদ্বিগ্ন হন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিয়ার সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হবে এবং তাঁকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করা হবে। এখন বাড়িতে গেলে প্রিয়া বন্ধু বা সহপাঠীদের বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন না; এমনকি বাড়িতে থাকাকালীন বন্ধুদের ফোনও এড়িয়ে চলেন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের ২৫ বছর বয়সী স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী অঞ্জলির রাজনৈতিক অবস্থানও পরিবারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিহারে বেড়ে ওঠা এই তরুণীর মা–বাবা বিজেপি ও আরএসএসের সদস্য। অন্যদিকে অঞ্জলি ছাত্রনেত্রী এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সঙ্গে যুক্ত। সংগঠনটি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী–লেনিনবাদী) বা সিপিআই (এমএল)-এর ছাত্রসংগঠন।
অঞ্জলি জানান, বামপন্থী রাজনীতিতে তাঁর যুক্ত হওয়া ধীরে ধীরে। একসময় তিনি নরেন্দ্র মোদির সমর্থক ছিলেন। পরে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি এআইএসএতে যোগ দেন। এতে তাঁর মা–বাবা বিব্রত হন। আন্দোলনের সময় তাঁর মা নিয়মিত ফোন করে অবস্থান জানতে চাইতেন। অঞ্জলি অনেক সময় পড়াশোনা বা কাজের কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতেন।
২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিমুখে বিক্ষোভকারীদের মিছিলের দিন পুলিশের লাঠিপেটায় অঞ্জলি আহত হন। তাঁর মা ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি আহত হয়েছেন কি না। পরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের খবর শুনে অঞ্জলি তাঁর মা–বাবার কাছ থেকে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া আশা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মা বরং খুশি হন এবং মেয়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা গর্বও প্রকাশ করেন। তিনি ঘটনাটিকে ‘একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেন।
অঞ্জলি তাঁর মায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘মা বলেছিলেন, এখানে পৌঁছাতে আমাদের হয়তো সময় লেগেছে, কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি, আমরা এটা করতে পারি।’ তবে তাঁর বাবা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। অঞ্জলিও এখনো বাবার মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে চলেন।
নেহা বোরা এই পরিবর্তিত পারিবারিক সম্পর্কের আরেকটি উদাহরণ। ২৯ বছর বয়সী নেহা এআইএসএর কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক। আন্দোলনের সময় তিনি ২৩ দিন অনশন করা বিক্ষোভকারীদের একজন ছিলেন।
নেহার বাবা একজন সেনা কর্মকর্তা এবং মা গৃহিণী। তাঁরা বিজেপির সমর্থক হওয়ায় মেয়ের বামঘেঁষা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহজভাবে নেননি। কিন্তু নেহা অনশনে বসেছেন জানতে পেরে তাঁর মা উত্তর প্রদেশের বেরেলি থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে যন্তর মন্তরে ছুটে আসেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর মেয়েকে অভিনন্দনও জানান তিনি।
সাম্প্রতিক এই আন্দোলন তাই কেবল সরকারের সঙ্গে তরুণদের রাজনৈতিক বিরোধের চিত্র নয়; একই সঙ্গে তা ভারতীয় পরিবারগুলোর ভেতরেও প্রজন্ম ও রাজনৈতিক আদর্শের ব্যবধানকে দৃশ্যমান করেছে। কুনাল, প্রিয়া, অঞ্জলি ও নেহার অভিজ্ঞতায় সেই বিভাজনের ভিন্ন ভিন্ন রূপ উঠে এসেছে।
