ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমারের চিন রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বড়থলি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের জীবন কাটছে নানা নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত অবস্থায়। ২৭৮ বর্গকিলোমিটারের দুর্গম এই পাহাড়ি ইউনিয়নে নেই কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক। স্থায়ী বাজারও নেই। প্রশাসনিক সেবা পেতে ইউনিয়নের বাসিন্দাদের প্রায় ২৭ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়।
রাইখ্যং হ্রদের তীরে অবস্থিত বড়থলি ইউনিয়নটি চারদিকে পাহাড় ও বন দিয়ে ঘেরা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় থাকা রাইখ্যং হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় এক মাইল। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, হ্রদ ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে ইউনিয়নটি কার্যত যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। রাঙামাটি জেলা সদর কিংবা বিলাইছড়ি উপজেলা সদরের চেয়ে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় যাতায়াত তুলনামূলক সহজ।
২০১৩ সালে ফারুয়া ইউনিয়নের দুটি ওয়ার্ড নিয়ে বড়থলি ইউনিয়ন গঠিত হয়। ২০২২ সালের সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী ইউনিয়নটির জনসংখ্যা ৩ হাজার ৫৯৫। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, বর্তমানে সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস। ইউনিয়নের অস্থায়ী পরিষদ কার্যালয় রয়েছে বান্দরবানের রুমা উপজেলায়।
এখানে তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমী ও ম্রো—এই পাঁচ জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের প্রধান জীবিকা পাহাড়ে জুমচাষ। বাসিন্দাদের মধ্যে খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রয়েছেন। ইউনিয়নে ১০টি গির্জা ও দুটি বৌদ্ধবিহার রয়েছে।
বড়থলি ইউনিয়নে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে নয়টি। তবে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। ফলে পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার পর অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। কেউ কেউ হ্রদ পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বর্ষায় পাহাড়ি ছড়া ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়।
বড়থলির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পলথনপাড়ার কারবারি মতি ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের অনেক বাচ্চা পড়তে চায়। কিন্তু বর্ষায় পাহাড়ি ঝরনা আর নদীর পানি বাড়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুদের স্কুলে পাঠানো যায় না। সপ্তাহের পর সপ্তাহ পড়াশোনা বন্ধ থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইউনিয়নে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হলেও বাসিন্দারা উপকৃত হতেন।’
বড়থলি থেকে বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে যেতে প্রায় দুই দিন সময় লাগে। বিপরীতে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় এক দিন। প্রয়োজনীয় সেবা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের জন্য বাসিন্দাদের প্রায় ২৭ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হাঁটতে হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক এবং ১২৪ নম্বর নাড়াইছড়ি মৌজার হেডম্যান শান্তি বিজয় চাকমা বলেন, ‘বড়থলি ইউনিয়নটি অত্যন্ত দুর্গম। বিলাইছড়ি সদরে আসতে আড়াই থেকে তিন দিন লাগে। ন্যূনতম নাগরিক সেবা পেতেই মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘ইউনিয়নে ২ হাজার ১০০ ভোটার এবং প্রায় ৫ হাজার জনসংখ্যা রয়েছে। কিন্তু কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসাকেন্দ্রে সুব্যবস্থা নেই। ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ও আরেক জেলায়, ২৭ কিলোমিটার দূরে। সেবা নিতে বা দিতে ২৭ কিলোমিটার হাঁটতে হয়, বাজারে কেনাকাটা করতে যাতায়াতেই চলে যায় দুই দিন।’
ভৌগোলিকভাবে রাঙামাটির বিলাইছড়ির অংশ হলেও বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয় বান্দরবানের রুমা উপজেলায়। স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্য, যোগাযোগের সুবিধার কারণেই রুমা থেকে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘এলাকাটি খুবই দুর্গম। যোগাযোগ সহজ হওয়ায় বান্দরবানের রুমা উপজেলায় বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হয়। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেখানে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল, তবে দুর্গমতা ও শিক্ষার্থী–সংকট থাকায় আপাতত এর কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।’
দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে বড়থলির বাসিন্দাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পাঁচ হাজারের মতো মানুষের এই ইউনিয়নে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
