কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে বিপুল মূল্যমানের সরকারি খাসজমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার মধ্যরাতে সৈকতের প্রবেশপথের ডান পাশে ১০ একরের বেশি জায়গা টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলে একটি চক্র। একই সঙ্গে সেখানে থাকা দুই শতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকাররা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, সৈকতসংলগ্ন ওই জমির বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। তবে জমির সঠিক আয়তন ও বাজারমূল্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো নিশ্চিত করেনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সুগন্ধা পয়েন্টের প্রবেশপথের ডান পাশে বড় একটি অংশ টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার মধ্যরাতে ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক সেখানে গিয়ে দ্রুত বেড়া নির্মাণ করেন। আরও ১০ থেকে ১২ জন ওই সময় ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিলেন।
কাজে নিয়োজিত কয়েকজন শ্রমিক জানান, প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও অনুসারীরা জায়গাটি ঘিরে দিয়েছেন। তবে তাদের পরিচয় বা নাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে তারা রাজি হননি।
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের অভিযোগ, বেড়া দেওয়ার আগে ওই এলাকায় দুই শতাধিক ভাসমান দোকান ছিল। রাতেই তাদের দোকান সরিয়ে নিতে চাপ দেওয়া হয়। এ নিয়ে কয়েকজন হকারের সঙ্গে শ্রমিকদের বাকবিতণ্ডাও হয়।
শনিবার বিকালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হকাররা লাঠিসোটা নিয়ে প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ টিনের বেড়ার একটি অংশ ভাঙচুর করেন।
উচ্ছেদ হওয়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাদের জায়গা ছাড়তে চাপ দেওয়ার সময় রাজনৈতিক প্রভাব দেখানোর পাশাপাশি মন্ত্রীর নামও ব্যবহার করা হয়েছে। এ কারণে অনেকে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি বলে তারা জানান।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন ওই মন্ত্রীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহাদাত হোসেন রিপন। তিনি জমি ঘেরাওয়ের ছবি প্রকাশ করে দাবি করেন, মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে একটি খালি প্লট দখলের চেষ্টা চলছে।
এক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, মন্ত্রী নিজে এসবের সঙ্গে জড়িত কি না, নাকি তাঁর নাম ব্যবহার করে কোনো প্রতিনিধি এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।
এ ঘটনায় বিএনপির মিডিয়া সেলের জেলা প্রতিনিধি আলমগীর চৌধুরীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত আসনের এমপি অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না বলেন, তিনি জেলার বাইরে অবস্থান করছেন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছেন। বিষয়টি মন্ত্রীকে জানানোর জন্য তিনি সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন।
মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পিএস হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, মন্ত্রীর নাম ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। কেউ তাঁর নাম ব্যবহার করে থাকলে এবং জমিটি সরকারি খাসজমি হলে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। আর জমিটি ব্যক্তি মালিকানাধীন হলে সংশ্লিষ্ট মালিক থানায় অভিযোগ করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, ঘেরাও করা জায়গাটি এস আলম গ্রুপের বাতিল হওয়া কোনো প্লটের অংশ হতে পারে। দখলকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাকর্মী থাকার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর হোসেন সায়েম জানান, সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখলের ঘটনায় জড়িত একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। জমিটির মালিকানা বা ইজারা সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র থাকলে তা জেলা প্রশাসক অথবা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সরকারি জায়গা দখল বা ঘেরাওয়ের অনুমতি প্রশাসন কাউকে দেয়নি। অবৈধ স্থাপনা ও টিনের বেড়া সরিয়ে নেওয়ার জন্য শনিবার বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশ অমান্য করে দখল বজায় রাখার চেষ্টা হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, জমি দখলের বিষয়টি তাঁকে অনেকে জানিয়েছেন। বিষয়টি যাচাই করে দখল উচ্ছেদ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে রোববার দুপুর পর্যন্ত ওই জমি থেকে টিনের বেড়া বা অন্য কোনো অবৈধ স্থাপনা অপসারণে কার্যকর অভিযান হয়নি বলে জানা গেছে।
সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় খাসজমি দখলের অভিযোগের পাশাপাশি হকার উচ্ছেদ, রাজস্ব দেওয়া অস্থায়ী কার্ড বাতিল এবং নতুন করে জমি ঘেরাওয়ের ঘটনায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত জমিটি দখলমুক্ত করে এর প্রকৃত সরকারি মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে এবং এর নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সরকারি জমি দখলের প্রবণতা ঠেকাতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
