পারিবারিক কারণে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন ক্যারোলাইন লেভিট। দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর পরিবারের জন্য যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন না—এমন উপলব্ধি থেকেই তাঁর এই সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত লেভিটের বিদায়কে তাঁর প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, লেভিট পদ ছাড়লেও বাইরের একজন উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে লেভিট শুধু প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেননি; প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক বক্তব্য ও ‘মাগা’ মতাদর্শের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর সংঘাতপূর্ণ আচরণ এবং ট্রাম্পের নীতির জোরালো সমর্থন তাঁকে প্রেস সেক্রেটারির প্রচলিত ভূমিকার বাইরে নিয়ে যায়।
লেভিট বলেছেন, গত মে মাসে দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর তিনি বুঝতে পারেন, সন্তানদের প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারছেন না। সেই উপলব্ধিই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ট্রাম্প প্রশাসনে প্রেস সেক্রেটারির কাজ বরাবরই জটিল। প্রেসিডেন্ট কখন কোন নীতি বা অবস্থান ঘোষণা করবেন, তা আগেভাগে অনুমান করা কঠিন। অনেক সময় ট্রাম্প নিজের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের বিপরীত অবস্থানও প্রকাশ্যে তুলে ধরেন। ফলে প্রেস সেক্রেটারিকে নিয়মিত পরিবর্তনশীল অবস্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়।
এই পরিস্থিতিতে লেভিট ছিলেন ট্রাম্পের অন্যতম কার্যকর মুখপাত্র। ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাষা ও অবস্থান ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাবলীল। তাঁর ব্রিফিংগুলোতে নীতিগত ব্যাখ্যার পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের অবস্থান ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেত।
ট্রাম্পের সমর্থকদের কাছেও লেভিট ছিলেন জনপ্রিয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়ার বদলে অনেক সময় প্রশ্নকর্তার উদ্দেশ্য নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলতেন তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর এমন আক্রমণাত্মক আচরণ ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলনের বিদ্রোহী চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই সংবাদমাধ্যমকে নিজের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। কখনো সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করেছেন, কখনো প্রশংসা করেছেন, আবার কখনো তাদের প্রতি মানুষের মনোযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে তাঁর এই কৌশল আরও শক্তিশালী হয়েছে।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর না করে ট্রাম্প সরাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করেন। ফলে তাঁর প্রশাসনে প্রেস সেক্রেটারির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও লেভিটের মতো দক্ষ ও অনুগত মুখপাত্র খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনে সংবাদমাধ্যমের ঐতিহ্যগত জবাবদিহির ভূমিকা সীমিত করার ক্ষেত্রেও লেভিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনেন এবং ট্রাম্পপন্থী পডকাস্টার ও স্থানীয় রেডিও উপস্থাপকদের প্রেস গ্রুপে যুক্ত করেন।
সমালোচকেরা এটিকে ট্রাম্পের প্রতি সহানুভূতিশীল সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন। তবে ট্রাম্পের সমর্থকেরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
এ ছাড়া মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ করার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় বার্তা সংস্থা এপির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রেও লেভিট ভূমিকা রাখেন।
লেভিটের পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক কারণ পারিবারিক। তবে তাঁর বিদায়ের সময়টিও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। গত মাসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প সাংবাদিকদের তীব্র সমালোচনা করার সময় লেভিট তাঁর পাশে ছিলেন। তাঁর মেয়াদের শেষ দিকের এই দৃশ্যকে লেভিটের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্পের গোপন বিমানযাত্রায় সাংবাদিকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই লেভিটের পদত্যাগের ঘোষণা আসে।
ডেমোক্রেটিক দলের প্রতিনিধি জেমস ওয়াকিনশ বলেছেন, লেভিট পারিবারিক কারণে পদ ছাড়ছেন—এ বিষয়ে তাঁর সন্দেহ নেই। তবে ট্রাম্পের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে প্রতিদিন জেনেশুনে বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
লেভিটের স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট পরিকল্পনা সামনে আসেনি। ঘনিষ্ঠ কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিবর্তে ট্রাম্প কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমনকি গুঞ্জন রয়েছে, প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব ট্রাম্প নিজেই কোনোভাবে সামলাতে পারেন।
তবে লেভিটের মতো শক্তিশালী ও ক্যামেরাসচেতন মুখপাত্র খুঁজে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না। তাঁর বিদায়ের পর সাংবাদিকদের জন্য প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত ও নীতির বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতার প্রদর্শন, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাত এবং প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক বার্তা প্রচারে লেভিট ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। পদ ছাড়লেও তাঁর কাজের ধরন ও রাজনৈতিক প্রভাব ভবিষ্যতেও আলোচনায় থাকবে।
