কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি দাবি দেখা দিয়েছে। ইরানের আধা সামরিক বাহিনী বাসিজের নবনিযুক্ত প্রধান হোসেইন তায়েব বলেছেন, জলপথটি এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালির ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
বাসিজপ্রধান হোসেইন তায়েব বৃহস্পতিবার বলেন, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে যুদ্ধ বাধিয়ে ইরানের জনপ্রিয়তা নষ্ট করার চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর দাবি, ইরানের বিমান ও নৌ সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের করা দাবিও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে তায়েব বলেন, ‘আজ আপনারা দেখছেন যে হরমুজ প্রণালি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ ইরান পূর্ণ নিরাপত্তা বজায় রেখে নিজের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স’ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তেহরানের অনুমতি ছাড়া কোনো নৌযান হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়, এ ধরনের বক্তব্য ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’।
গত জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছেছিল। এতে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং পারস্য উপসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই চুক্তি ভেঙে পড়ে। দুই দেশই পরস্পরকে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করে।
ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির শর্ত অমান্য করে চলাচল করা নৌযানের বিরুদ্ধে তারা আবার সীমিত আকারে হামলা শুরু করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, পারস্য উপসাগরে নৌযানকে লক্ষ্য করার ইরানের সক্ষমতা ধ্বংস করতে তারা দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে পুনরায় হামলা চালিয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরুর পর তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর আগে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানমুখী এবং ইরানের বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজের চলাচল ও বন্দরগুলোতে নৌঅবরোধ আরোপ করে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন জানায়, ইরান ছাড়া অন্য দেশের বন্দরগামী নৌযানগুলোর হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ চলাচল বা নেভিগেশনের স্বাধীনতা তারা নিশ্চিত করবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তেহরানের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইরানের শর্তগুলো পূরণ না হলে মোজতবার কৌশল হবে ‘আক্রমণাত্মক যুদ্ধ’।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল সমন্বয়ে ইরান ও ওমানের সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়ে মোখবার বলেন, ওয়াশিংটনের সামরিক নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর না করে ‘হরমুজ অর্থনৈতিক নিরাপত্তাব্যবস্থা’ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সবচেয়ে টেকসই পথ তৈরি হতে পারে।
এদিকে ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক-রাজনৈতিক কর্মকর্তা রাসুল সানাই-রাদ বলেন, অন্তর্বর্তী চুক্তির আওতায় অপর পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলবে না। ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়া এমন কোনো বিষয় নয়, যা যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে নিশ্চিত করতে পারবে।
ফলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচল নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের অবস্থান এখনো সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির ভবিষ্যৎ নৌ চলাচল নিয়ে দুই পক্ষের এই বিরোধ নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
