নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পর ত্রিশূলী এলাকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন টানেলে কাজ করা অন্তত এক হাজার শ্রমিকের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা নিজেরাই কাদা-পলিতে ভরা টানেল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। তবে আরও অনেকে ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ত্রিশূলী নদীর তীরে একটি টানেলে কাজ করছিলেন রাম চন্দ্র। আকস্মিকভাবে পানি, কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ টানেলের ভেতর দিয়ে ধেয়ে এলে তিনি ছাদে লাগানো একটি রিং শক্ত করে ধরে ফেলেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে তিনি নিজের পায়ের নিচে দেওয়ার জন্য একটি টিনের শিটও টেনে নেন।
রাম চন্দ্র জানান, পানি বাড়তে থাকায় তার পা নাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। রিংটি ছেড়ে দিলে তিনি পড়ে যেতেন। এভাবে একেকটি রিং আঁকড়ে ধরে তিনি ও তার সহকর্মীরা প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে ধীরে ধীরে টানেলের প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে যান।
তিনি বলেন, তারা প্রথমে ছয়জন ছিলেন। পরে টানেলের প্রবেশদ্বারের কাছে আরও একজনকে পান। শেষ পর্যন্ত তারা টানেল থেকে বের হয়ে এলেও পানির স্রোতে তাদের পরনের পোশাক পর্যন্ত ভেসে যায়।
আরেক বেঁচে যাওয়া শ্রমিক মদন সিং বুধা বলেন, আপার ত্রিশূলী সুড়ঙ্গ নম্বর ২-এর রাতের শিফট শেষ করে তিনি মাত্র বাইরে এসেছিলেন। বাইরে তাকিয়ে তিনি চারদিকে শুধু পানি দেখতে পান। এরপর প্রাণ বাঁচাতে পাহাড়ের দিকে দৌড় শুরু করেন। পাহাড়ের খাঁজে জন্মানো ঘাস আঁকড়ে ধরে তারা ওপরে উঠতে থাকেন। যারা ওপরে উঠতে পারেননি, তারা পানির স্রোতে ভেসে যান।
বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা পরে নিখোঁজ সহকর্মীদের সন্ধানেও অংশ নেন। তাদের অনেকেই নিজেদের আত্মীয় বা বন্ধুকে হারিয়েছেন। নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর পর স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া পোশাক ও স্যান্ডেল ব্যবহার করতে হয়েছে অনেককে।
ভক্তি রাম বোহরা জানান, ত্রিশূলী এলাকার বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় এক হাজার মানুষ কাজ করছিলেন বলে তিনি ধারণা করেন। নিখোঁজদের মধ্যে তার ভগ্নিপতিও রয়েছেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি জানান, তার ভগ্নিপতির স্ত্রী বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা।
উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে আসা ট্যুর গাইড অমর বিস্তা জানান, তার পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরাও এসব টানেলে কাজ করতেন। তিনি বলেন, যারা নিখোঁজ হয়েছেন তাদের স্বজনরা এখনো আশা ধরে রেখেছেন। তবে বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। অনেক পরিবার অল্পবয়সী সন্তান ও স্বজন হারিয়েছে।
উদ্ধারকারীদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো আবার সেই টানেলের ভেতরে প্রবেশ করা, যেখানে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অমর বিস্তা বলেন, কেউ সেখানে ফিরে যেতে চায় না, কিন্তু সবাই তাদের বন্ধু ও সহকর্মীদের ফিরিয়ে আনতে চায়।
ত্রিশূলী এলাকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেলগুলো পাহাড়ের অনেক গভীরে নির্মিত। পাহাড়ি নদীর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এসব প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে। আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে এসব প্রকল্পের বেশ কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উদ্ধারকারীরা বর্তমানে টানেলের ভেতরে বাতাস ও খাবার পৌঁছানোর জন্য ওপর থেকে ড্রিল করে গর্ত তৈরির চেষ্টা করছেন। কোনো জীবিত শ্রমিক ভেতরে আটকে থাকলে তাদের কাছে দ্রুত বাতাস ও খাবার পৌঁছে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।
নেপালের ভয়াবহ এই দুর্যোগে পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নদীর প্রবল স্রোত প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা ও জনপদে আঘাত হেনেছে। কাদা, বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের অনেকেই নেপালের দূর পশ্চিমাঞ্চলের জুমলা জেলার বাসিন্দা। কয়েক সপ্তাহ পরিবার থেকে দূরে থেকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করে তারা উপার্জনের অর্থ বাড়িতে পাঠাতেন। এখন তাদের অনেকেই সহকর্মীদের হারানোর শোক নিয়ে পরিবারের কাছে ফেরার পথে রয়েছেন।
