গাজীপুরে বনকর্মীদের ওপর এক বছরে ২০ হামলা, আহত অর্ধশতাধিক
গাজীপুরে বনভূমি দখল ঠেকাতে গিয়ে গত এক বছরে অন্তত ২০ বার হামলার শিকার হয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক বনকর্মী। সর্বশেষ গত ৩০ জুন শ্রীপুরের তেলিহাটি মৌজায় বন দখল প্রতিরোধ করতে গিয়ে দখলদারদের হাতুড়ির আঘাতে পা ভেঙেছে রেঞ্জ কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমানের।
বনকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় মাঠপর্যায়ের জনবল অনেকটাই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। একই সময়ে গত প্রায় এক বছর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কোনো উচ্ছেদ অভিযান না হওয়ায় বেহাত বনভূমি উদ্ধারের কার্যক্রম নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের শালবন ছয়টি রেঞ্জে বিভক্ত। ঢাকা বন বিভাগের অধীনে রয়েছে চারটি রেঞ্জ এবং ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীনে রয়েছে দুটি রেঞ্জ। দুই বিভাগের অধীন গাজীপুরে কাগজে-কলমে বনভূমির পরিমাণ ৫২ হাজার একরের বেশি।
তবে গত দুই দশকে গাজীপুরে ঠিক কত পরিমাণ বনভূমি দখল হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব বন বিভাগের কাছে নেই।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে নতুন করে বন দখল বেড়ে যায়। শুধু ২০২৪ সালেই গাজীপুরে বনভূমি দখল করে কমপক্ষে দুই হাজার ঘরবাড়ি, দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের তথ্য রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে গাজীপুরের শালবন থেকে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট উচ্ছেদ করে মোট ৪৮ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়।
এর মধ্যে ভাওয়াল ও জাতীয় উদ্যান রেঞ্জের অধীন ৩০ একর, শ্রীপুর রেঞ্জে ৪ একর এবং কালিয়াকৈর রেঞ্জে ১৪ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়।
তবে এরপর গত প্রায় এক বছরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আর কোনো উচ্ছেদ অভিযান হয়নি।
শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান জানান, বন দখল প্রতিহত করতে গিয়ে গত এক বছরে অন্তত ২০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে অর্ধশতাধিক বন কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি এবং পুলিশ প্রশাসনের সদস্যরা থাকার পরও উচ্ছেদ অভিযানে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলা হয়েছে।
মোকলেছুর রহমানের ভাষ্য, শুধু বন বিভাগের জনবল দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দিনরাত বনকর্মীরা হামলার আতঙ্কে থাকেন। এমনকি বন রক্ষায় নিয়মিত টহলে গেলেও হামলা ও ধাওয়ার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন উচ্ছেদ অভিযান না থাকায় বন দখলকারীরা আরও সংঘবদ্ধ হয়ে উঠেছে। বনভূমি রক্ষায় নিয়মিত টহল ও দখল প্রতিরোধের সময়ও বনকর্মীদের হামলা ও ধাওয়ার মুখে পড়তে হচ্ছে।
ফলে একদিকে দখল ঠেকাতে গিয়ে বনকর্মীরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন, অন্যদিকে বেহাত বনভূমি উদ্ধারের কার্যক্রমও দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বন উদ্ধারে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গত ছয় মাসে ২ হাজার ৬০০ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন করে কাউকে বন দখলের সুযোগ দেওয়া হবে না। পূর্বে বেদখল হওয়া বন ধারাবাহিকভাবে উদ্ধার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বন বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক এবং জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে ফলোআপ করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, অনেক বেসরকারি সংস্থা বন দখল করে আছে। এ বিষয়েও কাজ চলছে। যত দ্রুত সম্ভব বনের সব জমি বনকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা জানান তিনি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, প্রতিটি রেঞ্জের অধীন বিটগুলোতে বনভূমির জবরদখল প্রতিরোধ, দখল করা বনভূমি উদ্ধার এবং বনভূমির সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে জবরদখল করা বনভূমিতে নির্মিত ঘরবাড়ি, রিসোর্ট, শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন করে সৃষ্ট জবরদখলের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা জমিতে বনায়ন কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উচ্ছেদ অভিযানে প্রশাসনের সহযোগিতা থাকলেও হামলার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। এতে মাঠপর্যায়ের বনকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
নিয়মিত টহল ও বনভূমি দখল প্রতিরোধেও তাদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। ফলে বনভূমি উদ্ধারে কার্যকর অভিযান পরিচালনা এবং বনকর্মীদের নিরাপত্তা—দুই বিষয়ই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
